বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতার শিখতে গিয়ে মৃত্য়ু শিক্ষার্থীর ফারাক্কায় দ্রুত গতিতে চলছে লাইন মেরামতির কাজ মালদা মেডিকেলে শিশুমৃত্য়ুর জের, সাসপেন্ড সুপার অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

ক্যামাক স্ট্রিট কাণ্ডে অভিষেকের বিরুদ্ধে এফআইআর, হাইকোর্টেও স্বস্তিতে নেই তৃণমূল

28 August, 2026 3:01 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদন : দক্ষিণ কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের কার্যালয় থেকে বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড খোলাকে কেন্দ্র করে রীতিমতো রণক্ষেত্রের রূপ নিল এলাকা। বৃহস্পতিবার বিকেলের সেই তুলকালাম ঘটনার জেরে শেক্সপিয়র সরণি থানায় পরপর তিনটি পৃথক এফআইআর দায়ের করেছে কলকাতা পুলিশ। বেআইনি জমায়েত, সরকারি কাজে বাধা, মারধর, ওয়াকিটকি ছিনতাই থেকে শুরু করে মহিলা পুলিশকর্মীর শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে এই মামলাগুলিতে। এফআইআরে অভিযুক্তদের তালিকায় তৃণমূলের অন্যতম শীর্ষনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও নাম রয়েছে সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও হুমায়ুন কবীরের। ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে এখনও পর্যন্ত মোট ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পুলিশ সূত্রের খবর, প্রথম অভিযোগটি দায়ের করেছেন কলকাতা পুরসভার (কেএমসি) বিজ্ঞাপন বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজার সুদীপ কুমার বসু। তাঁর দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে বেআইনি জমায়েত, হিংসা ছড়ানো, মারধর ও পুরকর্মীদের প্রাণনাশের হুমকির মতো ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন কড়া ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। পুরসভার অভিযোগ, বেআইনিভাবে টাঙানো বিপজ্জনক বিলবোর্ড সরাতে গিয়ে চরম বাধা পান কর্মীরা। পুরসভার ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের ভয় দেখিয়ে সরাসরি বলপ্রয়োগ করা হয়।

দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করেছেন পার্ক স্ট্রিট থানার সার্জেন্ট সুজিত কুমার মণ্ডল। বিকেল সোয়া ৫টা নাগাদ ৯, ক্যামাক স্ট্রিটে চরম গোলমালের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছলে তাঁর নেতৃত্বাধীন পুলিশ বাহিনীর উপর আচমকা হামলা চালানো হয়। পুলিশকর্তার অভিযোগ, অকুস্থলে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকা একটি বিশালাকার ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড সরানোর সময় পুলিশকর্মীদের ধাক্কাধাক্কি করা হয় এবং সরকারি ওয়াকিটকি পর্যন্ত ছিনিয়ে নেয় দুষ্কৃতীরা।

একই ঘটনায় দায়ের হওয়া তৃতীয় এফআইআরে আরও মারাত্মক অভিযোগ আনা হয়েছে। যেখানে অভিষেক, ডেরেক ও বৈশ্বানর-সহ তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতার নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধাদানের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে উপস্থিত মহিলা পুলিশকর্মী ও পুরসভার নারী কর্মচারীদের উপর শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ এবং শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, কর্তব্যরত সরকারি কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে।

এদিকে পুলিশি অভিযান ও বিলবোর্ড খুলে ফেলার বিরুদ্ধে শুক্রবার সকালেই কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। উচ্চ আদালতের আইনজীবী কিশোর দত্ত হাই কোর্টের বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত জরুরি শুনানির আর্জি জানান। আদালত মামলা দায়ের করার অনুমতি দিলেও, এই মুহূর্তে তৃণমূলকে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন স্বস্তি দিতে অস্বীকার করে কলকাতা হাই কোর্ট।

মামলার প্রেক্ষিতে বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘ইতিমধ্যেই ওই হোর্ডিং খুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে এই অবস্থায় আদালতের এখনই হস্তক্ষেপ করার কোনো জরুরি প্রয়োজন নেই।’’ বিলবোর্ডটি পুনরায় স্বস্থানে বসানোর জন্য তৃণমূলের তরফ থেকে যে আর্জি জানানো হয়েছিল, তা এখনই শুনছে না আদালত। বিচারপতির বক্তব্য, মামলাটি বর্তমানে একেবারেই অপরিণত অবস্থায় রয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ঘটনায় যুক্ত সমস্ত পক্ষকে প্রথমে হলফনামা পেশ করতে হবে। হলফনামা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলেই কেবল শুনানির সময় ধার্য করা হবে।

তাছাড়া, বৃহস্পতিবারের অভিযানে ক্যামাক স্ট্রিটে কলকাতা পুরসভা ও পুলিশের যে সমস্ত আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের নামের তালিকা জমা দেওয়ার জন্য তৃণমূল যে বিশেষ আবেদন করেছিল, তাও খারিজ করে দিয়েছে হাই কোর্ট। পুরসভার পক্ষ থেকে আদালতে স্পষ্ট জানানো হয়, পুর-আইন অনুযায়ী শহরজুড়ে কোনো হোর্ডিং বা ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড লাগাতে গেলে পুরসভার বিজ্ঞাপন বিভাগ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হয় এবং নির্দিষ্ট কর মেটাতে হয়। ক্যামাক স্ট্রিটের ওই কার্যালয়ের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মই মানা হয়নি, তাই আইন মেনেই এই পদক্ষেপ।

অভিষেকের অফিসের সামনে গতকাল বিকেলে পুরসভার কর্মীরা কীভাবে গিয়ে হোর্ডিং ভেঙে দিয়েছেন এবং তাতে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির বেঞ্চেও জানানো হয় বলে দাবি করেছেন তৃণমূলের আইনজীবীরা। কিন্তু হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিল, আইনি প্রক্রিয়া মেনে হলফনামা না আসা পর্যন্ত হোর্ডিং ফেরত পাওয়া বা পুলিশের কাজে স্থগিতাদেশ দেওয়ার মতো কোনো পথ খোলা থাকছে না। ফলে একদিকে গ্রেফতারি ও পুলিশের দায়ের করা মারাত্মক ধারার মামলা, অন্যদিকে আদালতে ধাক্কা— জোড়া সাঁড়াশি চাপে পড়ল ক্যামাক স্ট্রিটের তৃণমূল শিবির।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee