বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

পিছু হঠল পেঙ্গুইন, ভারতে সনিয়ার আত্মজীবনী প্রকাশ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন

28 August, 2026 2:43 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

নয়াদিল্লি : সংগ্রাম, প্রেম, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং লুটিয়েন্স দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে ছাব্বিশ বছরের এক ইতালীয় তরুণীর মহীয়সী হয়ে ওঠার গল্প।

কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর বহুল চর্চিত আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ (Belonging: A Journey of Love) বাজারে আসার আগেই ভারতীয় রাজনৈতিক ও প্রকাশনা জগতে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তবে এই আত্মজীবনী ঘিরে বিতর্ক অন্য মাত্রা পেল যখন স্পষ্ট হয়ে গেল, ভারতে বইটির প্রকাশক হিসেবে থাকছে না খ্যাতনামা প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন। জল্পনা ছড়ায়, পাণ্ডুলিপির কিছু বিতর্কিত তথ্যের সম্পাদনা ও সত্যানুসন্ধান (ফ্যাক্ট চেক) সংক্রান্ত প্রস্তাবে সনিয়া গান্ধী সায় না দেওয়াতেই পিছিয়ে এসেছে পেঙ্গুইন। যদিও সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, কিন্তু প্রকাশনার ঠিক প্রাক-মুহূর্তে এই পিছু হঠাকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার অলিন্দে তীব্র গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই আত্মজীবনী প্রকাশের দৌড় থেকে পেঙ্গুইন সরে দাঁড়াতেই এখন ভারতের একাধিক শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থার মধ্যে স্বত্ব কেনার হিড়িক পড়ে গিয়েছে। সূত্রের খবর, বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘হার্পার কলিন্স’ (HarperCollins) ভারতে বইটির মুদ্রণ ও বণ্টনের স্বত্ব চূড়ান্ত করার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।

পরিস্থিতি জটিল হতেই শুক্রবার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করে সাফাই দিয়েছে পেঙ্গুইন। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, “পেঙ্গুইন ভারতে ‘বিলংগিং’-এর প্রকাশক নয়। লেখক সম্পাদনা সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কারণেই পেঙ্গুইন বইটি না ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছে— এমন কোনো দাবি বা জল্পনা বাস্তব পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে না।

তবে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংস্থাটি অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণভাবে যোগ করেছে, “একজন প্রকাশক হিসেবে লেখকদের বইয়ের তথ্য যাচাই করা এবং বইটির সর্বোত্তম স্বার্থে পাণ্ডুলিপিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা সংশোধন দেওয়া আমাদের অধিকারের পাশাপাশি নৈতিক দায়িত্বও বটে। প্রকাশনা প্রক্রিয়ায় এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ধাপ।”

পেঙ্গুইনের ভারতীয় শাখা পিছু হঠলেও আন্তর্জাতিক বাজারে কিন্তু বইটি নির্দিষ্ট সূচি মেনেই প্রকাশ পাচ্ছে। পেঙ্গুইন হাউসেরই মার্কিন সহযোগী সংস্থা তথা বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান প্রকাশনা সংস্থা ‘আলফ্রেড এ কফ’ (Alfred A Knopf) ঘোষণা করেছে, আগামী ১০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হতে চলেছে সনিয়া গান্ধীর এই বহু প্রতীক্ষিত আত্মজীবনী।

আমেরিকান প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বিবৃতিতে সোনিয়া গান্ধী তাঁর এই জীবনের দলিল সম্পর্কে লিখেছেন, “আমার পরিবারকে নিয়ে এ যাবৎ প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু খুব কম লেখাতেই তাঁদের প্রকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, কাজ কিংবা অত্যন্ত মানবিক ভুলত্রুটিগুলোর গভীরে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। বহু অর্থে এই বইটি তাঁদের সেই মানবিক সত্তার প্রতি আমার এক বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।” তিনি আরও যোগ করেন, “গত ছয় দশক ধরে আমার আপন করে নেওয়া এই অপূর্ব সুন্দর দেশে যে ঐতিহাসিক সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর আমি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি, এই বই পাঠকদের সামনে তারই এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে।”

আত্মজীবনীতে সোনিয়া গান্ধী অকপটভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে একের পর এক ব্যক্তিগত অঘটন তাঁর জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছিল। ১৯৮৪ সালে তাঁর শাশুড়ি তথা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং তার পরপরই স্বামী রাজীব গান্ধীর হাতে দেশের শাসনভার ওঠার ঘটনা তাঁকে তীব্র মানসিক ধাক্কা দেয়। এর ঠিক সাত বছরের মাথায় ১৯৯১ সালে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুমবুদুরে ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ হারান রাজীব গান্ধীও।

সেই মর্মান্তিক স্মৃতিচারণ করে কংগ্রেসের প্রাক্তন সভানেত্রী লিখেছেন, “হৃদয়ভঙ্গ আর প্রিয়জনকে হারানোর অপরিসীম বেদনাই আমাকে রাজনীতি নামক এই প্রকাশ্য ও কঠিন জগতে ঠেলে দিয়েছিল। তার আগে পর্যন্ত আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনকে অত্যন্ত কঠোরভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে আগলে রাখতাম।”

তিনি আরও বলেন, “নিজের জীবন নিয়ে লেখাটা আমার জন্য একেবারেই সহজ ছিল না। এর অর্থ ছিল নিজের ভেতরের আগলে রাখা গোপন অনুভূতি ও মুহূর্তগুলোকে সবার সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়া। কিন্তু সক্রিয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে যখন পিছন ফিরে তাকাই, তখন দেখি ইতালির ছোট শহরের কাটানো শৈশবের দিনগুলো থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ ও রাজীব গান্ধীর স্ত্রী হিসেবে ভারতে কাটানো জটিল দিনগুলোর মধ্য দিয়ে ভালোবাসাও আনুগত্যের এক অদৃশ্য সুতো আমার জীবনের গল্পকে একটি রূপ দিয়েছে।”

দীর্ঘদিন কংগ্রেসের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে থাকা সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলানো এবং ২০০৪ সালে বিপুল জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী পদ প্রত্যাখ্যান করার মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, তার অনেক অজানা অধ্যায়ের কথা উঠে আসবে এই বইয়ে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পেছনের অনেক অলিখিত গল্প জানার জন্য মুখিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল। আগামী ১০ নভেম্বর আত্মজীবনীটি আত্মপ্রকাশ করার পর ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন কোনো ঝড়ের সূচনা হয় কি না, আপাতত সেদিকেই কৌতূহলী নজর গোটা দেশের।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee