নেপালে ৫০০ ছুঁইছুঁই মৃত্যু, লাশের পাহাড়ে গণসৎকারের আশঙ্কা, বিদেশি উদ্ধারকারী ফেরাল বলেন্দ্র সরকার
কাটমান্ডু : হিমালয়ের কোলে প্রকৃতির ভয়াবহ রুদ্র তাণ্ডবে কার্যত শ্মশানে পরিণত হয়েছে নেপাল।
তিব্বত সীমান্ত থেকে নেমে আসা কাদা ও জলের ভয়াল হড়পা বানে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। সরকারি হিসাবে অন্তত ৪৭৫ জনের সলিলসমাধি সুনিশ্চিত হলেও নিখোঁজ এখনও হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যেই চিনের চরম গাফিলতি ও তথ্য গোপনের জেরে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অথচ, এমন মহাবিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েও এক অদ্ভুত অনড় কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছে নেপালের বলেন্দ্র শাহ সরকার। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে হাজার হাজার মানুষ যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আকুতি জানাচ্ছেন, তখন স্পষ্ট ভাষায় কাঠমান্ডু জানিয়ে দিয়েছে— পরিস্থিতি যতই গুরুতর হোক, তারা কোনো বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে দেশে ঢুকতে দেবে না।
গত বুধবার সকালে তিব্বতের গ্যিরং সীমান্তে এক বিশাল হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদের ব্যারেজ ভেঙে নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে আচমকা নামেন পাহাড়-প্রমাণ জল ও কাদার দেওয়াল। অভিযোগ, চিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা তিব্বত মালভূমিতে এই ভয়াবহ ধস ও হ্রদ তৈরির বিষয়ে আগে থেকে কোনও প্রাক-সতর্কবার্তা নেপালকে দেয়নি বেজিং। চিনের আধুনিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই তথ্য গোপন রেখে তারা নেপালকে নিশ্চিত বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন বিপর্যয় ঘটার পর চিন কেবল তাদের নিজেদের কর্মীদের দ্রুত সরিয়ে নিয়ে উদ্ধারকাজ বন্ধের বাহানা দিচ্ছে এবং দায় এড়াতে একে “নিয়ন্ত্রণহীন প্রাকৃতিক দুর্যোগ” বলে চালিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
কিন্তু বিপর্যয়ের ভয়াবহতা যখন কাটমান্ডুকে পিষে ফেলছে, ঠিক তখনই বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে লাল ফিতেয় আটকে দেওয়া নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে। ভারত, চিন, আমেরিকা, ব্রিটেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মতো একাধিক দেশ অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল পাঠাতে চেয়ে নেপালের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার সকালে সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নেপালের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী সাফ জানিয়ে দেন, “ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিদেশি সাহায্যের প্রস্তাব আসাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীই সফলভাবে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। আপাতত কোনো বিদেশি উদ্ধারকারী দলের প্রয়োজন নেই।”
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে বলেন্দ্র শাহ সরকারের বিশেষ ‘কূটনৈতিক অঙ্ক’। নেপাল ভূখণ্ডে চিন ও ভারতের মতো দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশীর উদ্ধারকারী বাহিনীকে একই সঙ্গে কাজ করতে দেওয়া বা কূটনৈতিকভাবে কোনও এক পক্ষকে বেছে নেওয়ার রাজনৈতিক ঝুকি এড়াতেই কাঠমান্ডু এই কড়া কৌশল নিয়েছে। উদ্ধারকারী দল ফেরানো হলেও অবশ্য মানবিক ত্রাণসহায়তা নিতে কোনও আপত্তি জানায়নি নেপাল। দুর্যোগের মারাত্মক আবহে ইতিমধ্যেই ভারত ৪৭.৫ টন খাদ্য ও ওষুধসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়া ১০ লক্ষ ডলারের অর্থ সাহায্যের ঘোষণা করেছে।
এদিকে প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক টানাফোড়েনের মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। উদ্ধার হওয়া লাশের পাহাড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। মর্গে দেহ রাখার আর এক ইঞ্চি জায়গা নেই। পোখারা অ্যাকাডেমি অফ হেল্থ সায়েন্স-সহ একের পর এক হাসপাতালের মর্গ ও অস্থায়ী শীতলীকৃত ঘর উপচে পড়ছে। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে দেহ শনাক্তকরণ নিয়ে। জলের তোড়ে বহু দেহ মূল ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ভেসে গিয়েছে, যা উদ্ধার করে আনতে ও আত্মীয়দের পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
পোখারা অ্যাকাডেমি অফ হেল্থ সায়েন্সের অধিকর্তা সুশীল আরিয়াল পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, “বর্তমানে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দেহগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এই অবস্থায় সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৪ দিন পচন রোধ করা সম্ভব। তার মধ্যে স্বজনরা এসে শনাক্ত করতে না পারলে আর কোনো উপায় থাকবে না।” প্রশাসনিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, সময়সীমা পেরিয়ে গেলে হাজার হাজার অশনাক্ত দেহের একসঙ্গেই গণসৎকার শুরু করতে বাধ্য হবে প্রশাসন।
হিমালয়ের পর্বতগাত্রে যেখানে এখনো নিখোঁজ ১,৪০০-র বেশি মানুষের স্বজনেরা কাদার স্তূপ আঁচড়ে বেঁচে থাকার চিহ্ন খুঁজছেন, সেখানে বিদেশি আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ধারকারী দলকে ঢুকতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে উঠছে প্রশ্ন। চিনের নীরব চক্রান্ত আর নেপালের একরোখা কূটনৈতিক অবস্থানের টানাপোড়েনে আপাতত লাশের স্তূপ ও হাহাকারের করুণ চিত্রই ঢাকা পড়ে রইল কুয়াশাচ্ছন্ন কাঠমান্ডুর আকাশে।
