আগাম তথ্য গোপনের অভিযোগ, নেপালে মহাবিপর্যয়ের মুখে দায় এড়াতে মরিয়া বেজিং
কাটমান্ডু/বেজিং: হিমালয়ের কোলে প্রকৃতির ভয়াবহ রুদ্ররূপ, আর তার মাঝেই প্রতিবেশী নেপালকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে নিজের পিঠ বাঁচানোর মরিয়া কূটনৈতিক চক্রান্তে মেতেছে চিন। তিব্বতের গ্যিরং সীমান্ত বন্দরে হিমবাহ ধসের ফলে তৈরি হওয়া বিশাল কৃত্রিম হ্রদের ব্যারেজ ফের ভেঙে পড়ে ডেকে এনেছে দ্বিতীয় দফার মহাবিপর্যয়। নেপাল সীমান্ত ঘেঁষে নেমে আসা এই ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া জলচ্ছ্বাসে ৪৬৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আর নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৪০০ ছাড়িয়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কত শত বিদেশি পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা চাপা পড়ে আছেন, তার হিসাব নেই। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে বেজিংয়ের সন্দেহজনক নীরবতা এবং সময়মতো তথ্য প্রদান না করে সম্পূর্ণ দায় ঝেড়ে ফেলার নগ্ন কৌশল।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাক-সতর্কবার্তা না দিয়ে নেপালকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেওয়া চিনের পুরনো অভ্যাস। কাটমান্ডুর উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক মহল সূত্রের খবর, বুধবার তিব্বতের গ্যিরং সীমান্তে যখন বিশাল ধসে নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে বিশাল জলধারার সৃষ্টি হচ্ছিল, তখন ড্রাগনের দেশ কোনো সতর্কবার্তা পাঠায়নি। ড্রোনে তোলা ছবিতে দেখা গিয়েছে যে কৃত্রিম রদের কাদা ও পাথরের বাঁধ ভেঙে যে কোনো মুহূর্তে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে, অথচ নেপাল পুলিশকে শেষ মুহূর্তে মাত্র ৯০ মিনিটের নোটিশে উদ্ধারকাজ বন্ধ করে পাহাড়ে ওঠার বার্তা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে শুরু করে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, তিব্বতে এত বড় হিমবাহ ধস ও কৃত্রিম জলাশয় তৈরির মতো মারাত্মক ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন চিন নিজের অত্যাধুনিক স্যাটেলাইটে দেখতে পেয়েও কেন নেপাল সরকারকে তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস দিল না?
ঘটনার পরপরই চিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও বেজিংয় পরিস্থিতিকে কেবল “নিয়ন্ত্রণহীন প্রাকৃতিক দুর্যোগ” বলে চালিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের বক্তব্য, পাহাড় ধসে সাময়িকভাবে তৈরি হওয়া হ্রদ হঠাৎ ফেটে যাওয়াতেই এই অঘটন। কিন্তু নিরপেক্ষ ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই যুক্তি সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন। গ্যিরং সীমান্তে চিনের অনিয়ন্ত্রিত পরিকাঠামো নির্মাণ, পাহাড়ি টানেল খোঁড়া এবং তিব্বত মালভূমিতে অবাধে ড্যাম তৈরি করার ফলে সেখানকার ভঙ্গুর ইকোসিস্টেম বহু আগেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়কে প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে চীন আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং সম্ভাব্য খেসারত দেওয়া থেকে বাঁচার ছক কষছে।
উদ্ধারকার্য বন্ধ করে চিন তাদের নিজস্ব কর্মীদের ও উদ্ধারকারী দলকে ১ কিলোমিটার পিছিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে দ্রুত নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে। কিন্তু নেপালের দিকে যখন তিব্বত থেকে আসা ওই পাহাড়-প্রমাণ জল ও কাদার স্রোত রসিকতার মতো ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও শত শত নিরীহ জীবন ভাসিয়ে নিয়ে গেল, তখন বেজিংয়ের একমাত্র কাজ ছিল একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি জারি করে হাত ধুয়ে ফেলা। রসুলিয়া জেলার সিনিয়র আমলা নরেন্দ্র পরিয়ার জানিয়েছেন, “আমরা চোখের সামনে দেখছি রসুয়া নদীতে নদীর জলের স্তর বিপজ্জনকভাবে লাফিয়ে বাড়ছে।” তবুও চীন এখনো কোনো টেকনিক্যাল ডেটা বা জলের নিখুঁত নির্গমন হার কাঠমান্ডুর সঙ্গে শেয়ার করেনি, যা চীন সরকারের চরম অমানবিকতা ও উদাসীনতাকেই তুলে ধরে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের দুর্বল অর্থনীতি এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অধীনে বেজিংয়ের বিপুল ঋণের ফাঁদে আটকে থাকার সুযোগ নিয়ে চিন এই চরম অব্যবস্থাপনা ও অপরাধমূলক গাফিলতিকে ধামাচাপা দিতে চাইছে। হিমালয় অঞ্চলজুড়ে নিজেদের ভৌগোলিক প্রাধান্য জাহির করলেও, সীমান্তপারের নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে আন্তর্জাতিক আইনি দায়িত্ব থাকে, তা মানতে চিন বরাবরই নারাজ। তিব্বতের এই বিপর্যয় ফের প্রমাণ করল, চরম বিপদের মুখে ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে বলির পাঁঠা বানিয়ে চিন নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এক ফোঁটাও দ্বিধা করে না।
বর্তমানে চিন তাদের উদ্ধার অভিযান স্থগিত রেখে কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, আর অন্যদিকে নেপালের পার্বত্য উপত্যকায় নিখোঁজ ১,৪০০ মানুষের পরিবার ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে বুক চাপড়াচ্ছে। প্রকৃতির তাণ্ডবের চেয়েও এখন হিমালয়ের বাতাসে তীব্র হচ্ছে চিনের বৈরী ও স্বার্থপর আচরণের বিরুদ্ধে ওঠা ক্ষোভের ঝড়।
