পম্পেইয়ের শেষ রাত
সন্দীপন বিশ্বাস : কেলসাস তখন সবে রুটির দোকান বন্ধ করেছে। সারাদিনের গরমে আটা মাখতে মাখতে হাত ব্যথা করছিল। কিন্তু আজকের বিক্রি ভালো হয়েছে বলে মনটা বেশ হালকা, ফুরফুরে। স্ত্রী ফাবিয়া উঠোনে বসে ছোট মেয়ে জুলিয়ার চুল বাঁধছিল, আর বড় ছেলে মার্কাস তখনও ফেরেনি। সে বন্ধুদের সঙ্গে অ্যাম্ফিথিয়েটারের দিকে গিয়েছিল গ্লাডিয়েটরদের লড়াই দেখতে। কেলসাসেরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাহলে দোকান বন্ধ রাখতে হতো। তাই সে যায়নি।
‘তাকিয়ে দেখো, আজকের আকাশটা কেমন যেন অদ্ভুত, না?’ ফাবিয়া বলল আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে।
কেলসাস কাঁধ ঝাঁকাল। বলল, ‘হ্যাঁ, কেমন যেন রহস্যের মতো থম মেরে আছে। মনে হচ্ছে একটা চাপা রাগে গরগর করছে।’ একটু দূরে ভিসুভিয়াস পর্বতের দিকে তাকাল সে। শান্ত পাহাড় যেন ঘুমিয়ে আছে। শুধু চূড়ার ওপর দিকটায় কিছুটা হালকা ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী। গত কয়েকদিন ধরে মাটি একটু একটু কাঁপছিল বটে, কিন্তু পম্পেইয়ে ভূমিকম্প নতুন কিছু নয়। সতেরো বছর আগে ৬২ সালে একবার বড় ভূমিকম্পে অর্ধেক শহর ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। তারপর আবার একটু একটু করে মানুষ ঘর তৈরি করেছে, জনপদ তৈরি করেছে। মানুষ ভুলে যায়। মানুষকে ভুলতেই হয়, নইলে বাঁচা যায় না।
সেকথা ভাবতে ভাবতেই কেলসাস বলল, ‘চিন্তা কোরো না। কাল বাজারে যাব, কিছু খাদ্যসামগ্রী কিনে রাখতে হবে। আবার যদি ভূমিকম্পের মতো বড় কোনও বিপর্যয় ঘটে।’
মনখারাপের অনুভূতি নিয়ে ফাবিয়া বলল, ‘তাই করব। কে জানে কপালে কী আছে!’
পরদিন, ২৪ আগস্টের দুপুরবেলা। ইতালির ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলের ছোট্ট শহরটা তখন ব্যস্ত। রাস্তায় মানুষের চলাচল, বাজারে চলছে কেনাবেচা, মদের দোকানে পাত্র ভরে উঠছে রঙিন উচ্ছ্বাসে। সব বাড়িতে তখন চলছে রান্নাবান্না, কিংবা খাওয়া দাওয়া। অন্যদিনের মতো কেলসাসও খুব ব্যস্ত তার রুটির দোকান নিয়ে। ওদিকে শহরের অভিজাতরা তাদের বিলাসবহুল ভিলায় ভোজের আয়োজনে ব্যস্ত। রাস্তায় ছোট ছোট ছেলেরা খেলা করছে। অ্যাম্ফিথিয়েটারে সেদিন ছিল একটা বড় কুস্তির আসর। সেখানে চলছিল প্রস্তুতি।
হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর শব্দ! অনেকটা হাড় কাঁপিয়ে দেওয়া গর্জনের মতো। কী হয়েছে, বুঝতে না পেরে সকলে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল। উফফ্ যেন আকাশ নিজেই ফেটে যাচ্ছে। কেলসাসও দোকানের বাইরে ছুটে এল। রাস্তায় সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেছে, মুখ তুলে তাকিয়ে আছে উত্তর দিকে। দেখা গেল, ভিসুভিয়াসের চূড়া থেকে সোজা আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে এক বিরাট কালো স্তম্ভ। স্তম্ভটা ওপরে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক যেন কোনও দৈত্যাকার ছাতাগাছের (Pine tree) ডালপালা।
আশপাশের প্রতিবেশীরা রাস্তায় বেরিয়ে আসছে, কেউ কেউ প্রার্থনা করছে, কেউ দেবতাদের কাছে বলি দেওয়ার জন্য মানত করছে। একজন বৃদ্ধ বলল, ‘এ তো জুপিটারের ক্রোধ! আমার মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর একটা কিছু ঘটতে চলেছে। সবাই সাবধান থাকো।’ আরেকজন বলল, ‘না, না, অকারণে ভয় দেখিও না। এ শুধু মেঘ, শীঘ্রই কেটে যাবে।’
মার্কাস সকালে কোথায় যেন বেরিয়েছে। তখনও ফেরেনি। বিকেল গড়াতে গড়াতে আকাশ অন্ধকার হয়ে এল। তখনও সূর্য ডোবার অনেকটাই বাকি। হঠাৎ কী যেন সব উড়ে আসতে লাগল। মিহি, ধূসর, বাতাসে ভাসতে ভাসতে নেমে আসা এক অদ্ভুত তুষারের চাদরের মতো। সবার চোখে মুখে পড়তেই বোঝা গেল, সেটা ছাই। তারপর শুরু হলো পাথর পড়া। কোন এক অদৃশ্য কোণ থেকে কেউ যেন অবিশ্রান্তভাবে পাথর ছুঁড়ে মারছে। ছোট ছোট ধূসর-সাদা ঝামা পাথর। যেন আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। ঘরের ছাদে দুদ্দাড় করে এসে পড়ছে।
ফাবিয়া জুলিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে ঘরের কোণে। দু’জনের চোখেই আতঙ্ক। ছোট্ট জুলিয়া মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে বলল, ‘মা আমার খুব ভয় করছে।’
কেলসাস বলল, ‘মনে হচ্ছে ছাদটা ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাইরেই বা যাব কী করে! পাথর পড়ে মাথা ফেটে যাবে যে!’
ফাবিয়া উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, ‘এই সময় মার্কাস কোথায় গেল? ও ফিরবে কী করে?’
‘আমি দেখছি’, কেলসাস বলল বটে কিন্তু দরজা খুলতেই মুখে ঝাপটা মারল গরম ছাই আর গন্ধকের তীব্র গন্ধ। যেন কেউ আজ ধ্বংসের দরজা খুলে দিয়েছে। বাইরে রাস্তায় ইতিমধ্যে পাথর জমে গোড়ালি ডুবে যাচ্ছে।
সে রাতের প্রথম প্রহরেই প্রতিবেশী পরিবারগুলো একে একে বেরিয়ে পড়তে লাগল। কেউ মাথায় বালিশ বেঁধে, আবার কেউ কাপড় দিয়ে মুখ জড়িয়ে। কেউ যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে, আবার কেউ ভাবছে ঘরে থাকাই ভালো। কেলসাসও দ্বিধায়। তাছাড়া মার্কাসকে ছাড়া কীভাবে তারা চলে যাবে!
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাথর পড়া আরও বেড়ে গেল। উড়ে আসতে লাগল আরও ভারী ভারী পাথর। কোথাও কোথাও ছাদ ভেঙে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আকাশে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের মতো আলো ঝলসে উঠছে। এতদিন তারা জানত আকাশ থেকে বাজ পড়ে। এবার তারা দেখল আগ্নেয়গিরির ভিতর থেকেও বাজ বেরিয়ে আসে। কেননা এর আগে তারা কখনও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত দেখেনি।
মধ্যরাতের দিকে মার্কাস ফিরল। সারা গায়ে ছাই, চোখেমুখে আতঙ্ক। মাথা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ফাবিয়া কেঁদে ফেলল। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলিস বাবা।’ মার্কাস বলল, ‘কিছুতেই আসতে পারছিলাম না মা। চারিদিকে পাথর পড়ছে। উত্তপ্ত সেই পাথর। অ্যাম্ফিথিয়েটারের ছাদ ভেঙে পড়েছে। বেশ কয়েকজনকে দেখলাম মাথায় পাথর পড়ে মারা গিয়েছে। বাবা আমাদের এখন এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়। আমাদের পালাতেই হবে।’
সেকথা শুনে কেলসাস বলল, ‘ঠিক বলেছিস। এখন না পালাতে পারলে বিপদ বাড়বে।’ সবকিছু গুছিয়ে নিল ফাবিয়া। মার্কাস বলল, ‘এত কিছু নিতে হবে না। প্রাণটুকু নিয়ে আমাদের বেরিয়ে পড়া দরকার।’ ভোর হয়ে আসছে। এ যেন অন্য ভোর। এক অনিশ্চত সকাল। ওপরে ঘরের ছাদে পাথরের চাপ বাড়ছে, একটা কড়িকাঠে ইতিমধ্যে ফাটল ধরেছে। কেলসাস বলল, ‘সবাই চলো নেপলস উপসাগরের দিকে। এখনও সময় আছে। একটা নৌকা পাওয়া গেলেই যথেষ্ট।’
মার্কাস বলল, ‘হ্যাঁ, জলই এখন নিরাপদ। ভেসে চলে যেতে হবে বেলাভূমি থেকে অনেক দূরে।’
তারা বেরিয়ে পড়ল অন্ধকারে, প্রতিটি পা ফেলা কঠিন হয়ে উঠেছে জমে থাকা পাথরের স্তরে। বাতাসে ছাই এত ঘন যে মশাল জ্বালিয়েও পথ ঠিকমতো দেখা যায় না। রাস্তায় ছড়িয়ে আছে ভাঙা টালি, ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র, আর মাঝে মাঝে কারো নিথর দেহ। যারা পাথরের আঘাতে বা দমবন্ধ হয়ে পড়ে গেছে পথেই।
জুলিয়া থরথর করে কাঁপছে। অবিরাম কেঁদে চলেছে সে। কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, ‘মা, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে…’
মায়ের বুক কষ্টে কেঁপে উঠল, তবে আমরা সবাই শেষ হয় যাব! মুখে বলল, ‘আর একটু, সোনা। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলো। আর একটু দূরেই সমুদ্র।’
বলতে বলতেই একটা তপ্ত হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগল। সেই সঙ্গে বিশাল এক গর্জন। সেই গর্জনের আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছে মমানুষের আর্তনাদ। গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে অআকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অআগুনের গোলা। সেগুলি যেন তাদের দিকেই ধাওয়া করে আসছে। সকলেই যে যেভাবে পারছে, বাঁচার জন্য ছুটছে।
কেলসাস শুধু জোরে চিৎকার করে বলল, ‘চলো এবার দৌড়াতে হবে।’ অন্যান্যদের মতো তারাও ছুটতে শুরু করল। যে ছোটার অভিমুখ ছিল জীবন, সেই লক্ষ্য তারা পৌঁছাতে পারেনি।
তারপর? ইতিহাস আমাদের বলে না কেলসাস, ফাবিয়া, মার্কাস বা জুলিয়া নামে কেউ ছিল কিনা, ঠিক এই মুহূর্তে, ঠিক এইভাবে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের এটা বলে যে এমন হাজারো পরিবার সেই রাতে ঠিক এই আতঙ্ক, এই দ্বিধা, এই ভালোবাসার টানাটানির মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। কী ভয়ঙ্কর ছিল সেই রাত!
ভোররাতের দিকে প্রথম পাইরোক্লাস্টিক সার্জ নেমে এল পাহাড় থেকে। সেটা ছিল প্রায় তিনশো ডিগ্রি উত্তাপের গ্যাস আর ছাইয়ের ঢেউ। ঘণ্টায় তার গতিবেগ শতাধিক কিলোমিটার। সকলেই সেদিন প্রাণের তাগিদে দৌড় দিয়েছিল। কিন্তু তারা কেউই বেশিদূর যেতে পারেনি। মৃত্যু এসেছিল মুহূর্তের মধ্যে, নিঃশব্দে, নির্মমভাবে।
সতেরোশো বছর পরে, যখন প্রত্নতাত্ত্বিকরা মাটি খুঁড়ে সেই মুহূর্তগুলোর ছাঁচ বের করে আনলেন, কী দেখা গেল? একে অপরকে জড়িয়ে ধরে থাকা মানুষ, সন্তানকে বুকে চেপে ধরা মা, শিকলে বাঁধা কুকুর। সেও শেষ মুহূর্তেও বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল।
বাণিজ্যনগরী পম্পেই শহরে বাস ছিল বারো হাজার মানুষের। তারা আর জীবনে কখনও সকাল দেখেনি। পরদিন সকালের মধ্যেই চার থেকে ছয় মিটার পুরু ছাই আর পাথরের নীচে সম্পূর্ণ চাপা পড়ে গিয়েছিল সেই জনপদ। প্রতিবেশী শহর হারকিউলেনিয়ামও একইভাবে ধ্বংস হয়েছিল, যদিও ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। প্রায় সতেরোশো বছর ধরে পম্পেই ছিল বিস্মৃত, মাটির নীচে ঘুমিয়ে থাকা এক শহর। ষোড়শ শতাব্দীতে আকস্মিকভাবে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে পদ্ধতিগতভাবে খননকার্যের পর সমস্ত ইতিহাস জানা যায়।
