বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

সিটংয়ের হোমস্টেতে অগ্নিদগ্ধ তরুণী, ঘনাচ্ছে রহস্য

18 September, 2026 2:23 PM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

সংবাদদাতা, শিটং: বিয়ের পর একসঙ্গে পথচলার শুরুটা হওয়ার কথা ছিল রূপকথার মতো। কিন্তু উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি নিস্তব্ধতায় মায়াবী বিকেল যে এমন এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি নবদম্পতি। দার্জিলিং জেলার ছবির মতো সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম সিটংয়ে মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে বার্বিকিউ করার সময় হঠাৎই ঘটে গেল এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। বারান্দায় বারবিকিউ তৈরি করার মুহূর্তে আগুনের প্রচণ্ড ঝলকানি এসে লাগে পর্যটক মহিলার গায়ে। স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন স্বামীও। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁরা।
স্থানীয় এবং পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, কিছুদিন আগেই বিয়ে হয় উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার বাসিন্দা শৌভিক দাস ও নিকিতা সাহার। তার পরই  উত্তরবঙ্গে মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিলেন ওই দম্পতি। পাহাড়ের নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করতে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন কার্শিয়াং মহকুমার সিটং এলাকার একটি হোমস্টে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় পাহাড়ের ঠান্ডা আবহাওয়া আর কুয়াশায় ঘেরা পরিবেশে হোমস্টের খোলামেলা বারান্দায় বার্বিকিউ-এর বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। দম্পতি অত্যন্ত আনন্দঘন মুহূর্ত কাটাতে কাটাতে নিজেরাই আগুন জ্বালিয়ে মাংস ঝলসানোর কাজ করছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং হোমস্টে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানা যায়, বারবিকিউ-এর আগুন দ্রুত জ্বালানোর জন্য কোনও দাহ্য পদার্থ বা জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ই আচমকা বিকট শব্দের সঙ্গে আগুনের বিশাল শিখা লাফিয়ে ওঠে। চোখের পলকে সেই আগুনের ঝলকানি গিয়ে পড়ে মহিলার গায়ে। মুহূর্তে সুতির পোশাকে আগুন ধরে যায় এবং তা ছড়িয়ে পড়ে  সারা শরীরে।
স্ত্রীর আর্তনাদ শুনে তাঁকে বাঁচাতে যান স্বামী। খালি হাতে এবং কাছে থাকা জামাকাপড় দিয়ে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালান। স্ত্রীর গায়ের আগুন নেভাতে গিয়ে তাঁর নিজের দুটি হাত, মুখ এবং শরীরের বেশ কিছু অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। দম্পতির চিৎকার এবং আগুন দেখে হোমস্টের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরাই  প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং দম্পতিকে উদ্ধার করেন।
ঘটনার পরপরই পাহাড়ের দুর্গম পথ  পেরিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁদের প্রথমে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মহিলার শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যাওয়ায় এবং শারীরিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকায় শিলিগুড়ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে খবর, মহিলার অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর এবং তাঁর শরীরের ৬০ শতাংশের বেশি অংশ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। বর্তমানে তিনি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (ICU)  লড়াই করছেন। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যদিকে, প্রাথমিক চিকিৎসার পর স্বামীর শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও তিনি মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছেন। খবর পেয়ে স্থানীয় থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং হোমস্টের বারান্দাটি খতিয়ে দেখে।  বারবিকিউ অনভিজ্ঞভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল নাকি হোমস্টে কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তার গাফিলতি ছিল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

এদিকে ভাইরাল হওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, বারবিকিউয়ের পাশে বসেছিলেন দম্পতি। তাঁদের উল্টোদিকে  বসে থাকা এক ব্যক্তি কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়ান। এরপর একটি ক্যান থেকে কিছু তরল পদার্থ বারবিকিউয়ের আগুনে ঢেলে দেন।  কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আগুন আচমকা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। বারবিকিউয়ের আগুনে কী তরল ঢালা হল, কেনই বা ঢালা হল। এমন দাহ্য তরল কেন হাতের কাছে রাখা ছিল।  কেনই বা ওই ব্যক্তি  আগুনে ওই তরল ঢেলে দিলেন, উঠছে এরকম একাধিক প্রশ্ন। যা তদন্ত করবে পুলিশ।

এদিকে নিকিতার মামা তাপস কুমার দাস ঘটনার দায় হোম-স্টে’র ওপর চাপিয়েছেন ৷ তাঁর কথায়, “কোনও সিস্টেম মেনে বনফায়ারের ব্যবস্থা করা হয়নি ৷ আমার ভাগ্নির জীবন যেতে বসেছে ৷ এর দায় কে নেবে ? ওই ঘটনার পর হোম-স্টে’র কেউই কোনও ব্যবস্থা নেয়নি ৷ ওখানেই নিকিতা আর ওর স্বামী পড়েছিল ৷ এ বিষয়ে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছেন নিকিতার স্বামী শৌভিকও।

সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন হোমস্টেতে বারবিকিউয়ের জনপ্রিয়তার  ফলে খোলা আগুনের ব্যবহার বেড়েছে। অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বা প্রাথমিক সুরক্ষাবিধি না মেনেই অনেক ক্ষেত্রে এই কাজ করা হচ্ছে। ফলে বিপদ বাড়ছে। ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন পর্যটন বিশেষজ্ঞরা। আনন্দের এক মুহূর্ত কীভাবে এক পলকে চরম ট্র্যাজেডিতে বদলে গেল, তা ভেবে শিউরে উঠছেন স্থানীয়রা।

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik