বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

AI আজ আছে কাল নেই, বিশ্বকর্মার আশীর্বাদধন্য মানুষের কারিগরী দক্ষতা অবিনশ্বর

17 September, 2026 1:26 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

পুলকেশ সেনগুপ্ত

এক হাতে নির্মাণের শক্তি, অন্য হাতে সৃষ্টির কল্পনা। পুরাণের বিশ্বকর্মা যেন সেই আদিম কারিগরের প্রতীক। তিনি শৈল্পিক ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেন। দেবতাদের জন্য প্রাসাদ, রথ, অস্ত্র কিংবা অলঙ্কার। এসব নির্মাণ করেছেন তিন। ভারতীয় পুরাণে বিশ্বকর্মার পরিচয় একজন অসাধারণ নির্মাতা ও শিল্পী হিসেবে। তিনি দেবশিল্পী।

সেই বিশ্বকর্মার পুজোর দিন যখন কারখানার মেশিন, গাড়ি, যন্ত্রপাতি কিংবা কাজের সরঞ্জাম পুজো করা হয়, তখন প্রশ্নটা অন্য জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। কারিগর বলতে আমরা কাকে বুঝি? একসময় কারিগর মানেই ছিল মানুষের হাত। কামারের হাতুড়ির শব্দ, ছুতোরের করাত, মৃৎশিল্পীর আঙুলের ছাপ, তাঁতির তাঁত, মেকানিকের রেঞ্চ। দক্ষতা মানেই ছিল দীর্ঘ অভ্যাসের মধ্য দিয়ে তৈরি হাত ও মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম নিপুণতা। একটি জিনিস তৈরি করতে লাগত শ্রম, সময় এবং অভিজ্ঞতা। তারপর এল যন্ত্র।

মানুষের হাতের কাজকে ধীরে ধীরে মেশিনের গতি ছাপিয়ে যেতে শুরু করল। শিল্পবিপ্লব উৎপাদনের ধারণাটাই বদলে দিল। কারখানায় একই কাজ বারবার করার ক্ষমতা পেল যন্ত্র। কিন্তু যন্ত্র তখনও মানুষের নির্দেশেই চলত। কারিগর ছিলেন মানুষ, মেশিন ছিল তাঁর হাতিয়ার। আজ সেই সম্পর্কও বদলাচ্ছে। রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এসে গেছে। এখন তারা শুধু মানুষের নির্দেশ পালন করছে না, নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তের মতো আউটপুট তৈরি করতে পারছে। এছাড়া ছবি বানানো, লেখা তৈরি করা, কোড লেখা, এমনকী জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারছে। অর্থাৎ, ‘কারিগর’-এর সংজ্ঞা আর শুধু হাতের দক্ষতার মধ্যে আটকে নেই। সেই দক্ষতা এখন হাত থেকে পৌঁছে গেছে অ্যালগরিদমে।

একজন মৃৎশিল্পী মাটি দিয়ে একটি প্রতিমা তৈরি করেন। একজন কাঠশিল্পী কাঠকে রূপ দেন। একজন ইঞ্জিনিয়ার নকশাকে বাস্তবে পরিণত করেন। আর AI সিস্টেম? সে মূলত বিপুল পরিমাণ তথ্য ও মানুষের তৈরি উদাহরণ থেকে শেখা প্যাটার্ন ব্যবহার করে নতুন আউটপুট তৈরি করে। তার নিজের হাতে কোনও হাতুড়ি নেই, নেই করাত, নেই তুলির আঁচড়। কিন্তু মানুষের ভাষায় লেখা নির্দেশকে সে একটি লেখা, ছবি, নকশা বা কোডে রূপ দিতে পারছে।

তাই AI-কে সরাসরি ‘কারিগর’ বলা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কারণ AI-এর নিজস্ব মানবিক অভিজ্ঞতা, শ্রমের অনুভূতি কিংবা সাংস্কৃতিক জীবন নেই। তার কাজের পেছনে রয়েছে মানুষের তৈরি ডেটা, অ্যালগরিদম এবং কম্পিউটিং পরিকাঠামো। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট! সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় মানুষের ভূমিকা বদলাচ্ছে। এখানে ভয়ঙ্কর একটা অস্তিত্ব সম্পর্কিত প্রশ্ন এসে যায়! তাহলে মানুষের অবস্থান কোথায়?
এই প্রশ্নটাই সম্ভবত আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। AI যদি ছবি তৈরি করে, তাহলে শিল্পী কে? AI যদি সংবাদ কপি তৈরি করে, তাহলে সাংবাদিক কে? AI যদি সফটওয়্যারের কোড লিখে দেয়, তাহলে প্রোগ্রামার কী করবেন? এর উত্তর এখনও চূড়ান্ত নয়। কারণ প্রযুক্তি সাধারণত কোনও পেশাকে একদিনে শেষ করে দেয় না। বরং পেশার কাজের ধরন বদলে দেয়। যে কাজ একসময় একজন মানুষকে সম্পূর্ণভাবে করতে হতো, তার কিছু অংশ এখন মেশিন করতে পারে। ফলে মানুষের কাজ ক্রমশ সরে যেতে পারে নির্দেশনা, যাচাই, সম্পাদনা, সিদ্ধান্ত, সৃজনশীলতা ও দায়িত্বের দিকে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আজ বিশ্বকর্মার পুজোর নতুন অর্থকে মেনে নিতে হবে। বিশ্বকর্মা পুজোর মূল প্রতীক তাই আজ আরও বিস্তৃতভাবে ভাবা যেতে পারে। যন্ত্রের পুজো শুধু যন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা নয়। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের নির্মাণক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধা। যে মানুষ পাথর কাটে, যে মানুষ ইঞ্জিন বানায়, যে মানুষ বিদ্যুৎ তৈরি করে, যে মানুষ সফটওয়্যার লেখে, সকলেই কোনও না কোনও অর্থে নির্মাতা। আজ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে AI। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, AI যত শক্তিশালীই হোক, তার পিছনে রয়েছে মানুষের জ্ঞান, গবেষণা, শ্রম এবং প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো। তাই বিশ্বকর্মার যুগ থেকে AI-এর যুগে আসার গল্প আসলে মানুষের কারিগরি ক্ষমতারই বিবর্তনের গল্প।

আগে মানুষ পাথর দিয়ে অস্ত্র বানিয়েছে। তারপর ধাতু দিয়ে যন্ত্র। তারপর যন্ত্র দিয়ে আরও বড় যন্ত্র। এখন মানুষ এমন যন্ত্র তৈরি করছে, যা মানুষের ভাষা বুঝে নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। এই যাত্রার শেষ কোথায়, তা এখনও জানা নেই। তবে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে। সেটা হল কারিগর কি সেই মানুষ, যে নিজের হাতে কিছু বানায়? নাকি সেই মানুষ, যে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যার সাহায্যে নতুন কিছু তৈরি করা সম্ভব? সম্ভবত আগামী দিনের বিশ্বকর্মা পুজোয় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। কারণ প্রযুক্তি বদলেছে। যন্ত্র বদলেছে। কাজের ধরনও বদলেছে। কিন্তু সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা? সেটি এখনও মানুষেরই। একান্তভাবে তার। এই আকাঙ্ক্ষা থেকে সৃষ্টি। আজ AI তাকে সাহায্য করছে। আগামী দিনে অন্য কোনও প্রযুক্তি আসবে। মানুষের মনের শিল্পভাবনা বদলাবে। বিশ্বকর্মার আশীর্বাদধন্য মানুষই কিন্তু সবকিছুর নিয়ন্ত্রক থাকবে। তার কারণ মানুষের শিল্পীমনের হদিশ যন্ত্র কোনওদিনই পাবে না।

প্রতিবেদন

UTSAB RC