টাটার অন্দরে টানাপোড়েন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রশ্নের মুখে পুরনো আস্থা
টাটা, ভারতের কর্পোরেট জগতে এই নামটির সঙ্গে শুধু ব্যবসা নয়, দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে আস্থা, স্থায়িত্ব এবং নির্ভরযোগ্যতার ধারণা। কিন্তু সেই টাটার অন্দরেই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একাধিক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের বোর্ড এন চন্দ্রশেখরনের কার্যকাল আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। বোর্ডের ভোটের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ট্রাস্টস।
শুধু নেতৃত্বের প্রশ্নই নয়। টাটা সন্সকে ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়েও দুই বোর্ডের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, টাটার মতো এত বড় একটি গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে কি অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের অভাব তৈরি হচ্ছে? আরও বড় প্রশ্ন প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে। একই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি বোর্ড এবং তার প্রধান মালিকানা ট্রাস্টের অবস্থান পরস্পরবিরোধী হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্থিতিশীল হতে পারে? এই যে প্রকাশ্যে আসা মতপার্থক্য, তা কি শুধুই স্বাভাবিক কর্পোরেট বিতর্ক, নাকি এর পিছনে রয়েছে গভীরতর পরিচালন সমস্যা? এই বিতর্কের মাঝে সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
টাটা ট্রাস্টসের পক্ষ থেকে বোর্ডের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তার আইনি নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে কোনও পক্ষের অবস্থানকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে টাটা শুধু একটি কোম্পানি নয়, একটি দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের নাম। সেই কারণেই অন্দরমহলের এই সংঘাতের আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কি শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থাতেও প্রভাব ফেলতে পারে? নাকি বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ধরনের ক্ষমতা, নেতৃত্ব ও কৌশল নিয়ে মতবিরোধ আসলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ? এই দ্বন্দ্বে টাটা গ্রুপে দীর্ঘমেয়াদী ভাবমূর্তি এবং সামগ্রিক ব্যবসায় চারদিক থেকে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। টাটা গ্রুপের মূল শক্তি হলো তাদের সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং ব্যবসায়িক সততা। বোর্ডরুমের এই প্রকাশ্য বিবাদ বিনিয়োগকারী, অংশীদার এবং গ্রাহকদের কাছে তাদের সেই চিরাচরিত ভাবমূর্তিতে আঘাত লাগতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে টাটা গ্রুপ অ্যাপল, এনভিডিয়া, এয়ারবাস এবং বোয়িংয়ের মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে বড় ধরনের চুক্তি করেছে। শীর্ষ মহলের এই ক্ষমতার লড়াই তাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তাছাড়া শেয়ার বাজারে তাদের একটা বড় প্রভাব আছে। টাটা সন্সের এই টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে তাদের চাঙ্গা শেয়ারগুলিতে। টাটা মোটরস, টাটা স্টিল বা টিসিএসের মতো সহযোগী বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ট্রাস্ট বনাম বোর্ডের এই বিরোধ যদি জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত গড়ায়, তবে ২০১৬ সালের সাইরাস মিস্ত্রি দ্বন্দ্বের মতোই শত শত কোটি টাকা শুধু আইনি ফি বাবদ খরচ হতে পারে। টাটা মোটরস বা টিসিএস স্বাধীনভাবে চললেও, মূলধনের বরাদ্দ এবং বড় ধরনের কৌশলগত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত আসে মূল হোল্ডিং কোম্পানি টাটা সন্স থেকে। ট্রাস্ট ও বোর্ডের দ্বন্দ্বে এই সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া শ্লথ বা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কর্পোরেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দ্বন্দ্ব দ্রুত না মিটলে ভারতের পুঁজিবাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্য পরিমণ্ডলে টাটার নির্ভরযোগ্যতায় বড় ধরনের চিড় ধরতে পারে।
আরও পড়ুন: ঐতিহ্য ও বিজ্ঞানের অভিনব মেলবন্ধন নিউটাউনের দুর্গাপুজোয়
তবে সব প্রশ্নে উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। এখনই সংস্থার ভবিতব্য নিয়ে কোনও মন্তব্য করাও অসম্ভব। তবে প্রশ্নগুলি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। টাটার নেতৃত্বে কি সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে? সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো কি আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার? দীর্ঘদিনের বজ্রকঠিন পরিচালন ব্যবস্থা কি এবার পরীক্ষার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে? বিশেষ করে রতন টাটার মৃত্যুর পর থেকে ধীরে ধীরে একটা দুর্বলতার প্রকাশ ঘটছে, যেটা একেবারেই কাম্য নয়। টাটার মতো প্রতিষ্ঠান সব দেশে জন্মায় না। শুধু সংস্থার কয়েকজনের কর্তাব্যক্তির ব্যক্তিগত কারণে, তার ওপর আঘাত এলে তাতে দেশেরও আর্থিক ক্ষতি।
