বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

চার্লি চ্যাপলিন ও নানা পাটেকর: রুটিই ছিল তাঁদের কাছে প্রথম প্রেম

09 October, 2026 11:40 AM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

সন্দীপন বিশ্বাস

আমেরিকার এক সাংবাদিক একবার চার্লি চ্যাপলিনকে প্রশ্ন করেছিলেন, এক কথায় যদি আপনার ছবির থিমকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, তাহলে আপনি কী বলবেন? চার্লি তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘Then I get into  a single situation : hunger, ‘Food, I must have food’. বারবার তাই দেখি চ্যাপলিনের ছবিতে ক্ষুধার দৃশ্য নানা ভাবে ফিরে আসে। কখনও তা ব্যঙ্গ, কখনও যন্ত্রণা, কখনও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা তাঁর ছবিতে একটা প্রতীক। এই ক্ষুধা দিয়ে চ্যাপলিন বিদ্ধ করেছেন পুঁজিবাদী সমাজের লোর্ভল, হৃদয়হীন সত্তাকে। এর কারণ হল শৈশবে বারবার তাঁকে ক্ষুধার কষ্ট বুঝতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ছবিতে।

একবার বলিউডে শ্যুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা চলছে। অনিল কাপুর সেই ফাঁকে নানা পাটেকরকে ঠাট্টার ছলে বললেন, নানা, তোমার জীবনে কোনও প্রথম প্রেম আছে? নানা বললেন, হ্যাঁ আছে।

অনিল বললেন, সেই গল্পটা আমাদের বল। খুব রোম্যান্টিক নিশ্চয়? নানা বললেন  হ্যাঁ, খুব রোম্যান্টিক। আমার প্রথম প্রেম রুটির সঙ্গে। জীবনে এতবার ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করেছি যে, মনে হয়েছিল রুটিই আমার জীবনের একমাত্র প্রেম, একমাত্র রোম্যান্টিসিজম।

চার্লি চ্যাপলিন আর নানা পাটেকর—দু’জনের সময় আলাদা, দেশ আলাদা, পরিপ্রেক্ষিত আলাদা, তাঁদের শিল্পের ভাষাও আলাদা। কিন্তু জীবনের একেবারে গোড়ায় তাঁরা যেন একই সত্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, ক্ষুধার কাছে মানুষ কতটা অসহায়! আর সেই কারণেই তাঁদের কাছে রুটি শুধু খাবার নয়, মানুষের বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত।

চ্যাপলিন ছোটবেলায় দারিদ্র্যকে দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। নানা পাটেকরের শৈশবও ছিল অভাবের। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। সিনেমার পোস্টার আঁকা, দেওয়ালে বিজ্ঞাপন লেখা। যখন যে কাজ পেয়েছেন, করেছেন। মাসে ৩৫ টাকা আয় করতেন। তাঁর জীবনটাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে এই দৃষ্টিকোণ থেকে।

সম্ভবত সেই কারণেই পরবর্তীকালে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেও নানা পাটেকর টাকার সঙ্গে নিজের সম্পর্কটাকে একটা নির্দিষ্ট তালে বেঁধেছিলেন। কোটি কোটি টাকা উপার্জন করলেও টাকার সঙ্গে নিজের জীবনের দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। টাকা তাঁর কাছে জীবনের শেষ কথা হয়ে ওঠেনি।

বলিউডের একজন বড় তারকা হয়েও তাঁর জীবনযাপন ছিল আশ্চর্য রকম সাধারণ। মুম্বইয়ের সাধারণ ওয়ান বিএইচকে ফ্ল্যাটে থাকতেন। সাদা কুর্তা, গামছা, চপ্পল! ব্যস, এই ছিল তাঁর পরিচিত চেহারা। আর সুযোগ পেলেই চলে যেতেন পুনের ফার্মহাউসে। সেখানে ধান, গম, পেঁয়াজ, রসুন চাষ করতেন। গোরু-বলদ, ছাগল, কুকুর আর মাটির সঙ্গে সময় কাটানোই ছিল তাঁর কাছে অনেক বেশি স্বাভাবিক জীবন।

এখানেই নানা পাটেকরের জীবনের একটা বড় দিক বোঝা যায়। তিনি কৃষককে দূর থেকে দেখেননি। নিজেও মাটির কাছে ফিরেছিলেন। কৃষকদের জন্য তাঁর কাজ শুরু হয়েছিল একটা গভীর যন্ত্রণা থেকে। ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রে খরা ও কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা তাঁকে নাড়া দিয়েছিল। প্রথমে নিজের উদ্যোগে তিনি আত্মহত্যা করা কৃষকদের পরিবারের পাশে দাঁড়ান। বিদর্ভের ৬২টি পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে সাহায্য করেছিলেন। পরে লাতুর ও ওসমানাবাদ এলাকার আরও ১১৩টি পরিবারকে সাহায্য করেন।

কিন্তু নানা বুঝেছিলেন, একবার টাকা দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। তাই মকরন্দ আনাসপুরেকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। লক্ষ্য শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে টাকা দেওয়া নয়। লক্ষ্য ছিল স্থায়ী কোনও সমাধানকে কৃষকদের জীবনে পৌঁছে দেওয়া। জলসংকটের মোকাবিলা, জল সংরক্ষণ, কৃষকের জীবিকা এবং গ্রামকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো। ফাউন্ডেশনের নিজেদের রিপোর্টেও বলা হয়েছে, কৃষক পরিবারকে সাময়িক আর্থিক সাহায্য যথেষ্ট নয়। সমস্যার শিকড়ে রয়েছে জলসংকট এবং কৃষির কাঠামোগত সমস্যা।

এখানে একটি উদাহরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সোলাপুরের কাটফল গ্রামে ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে একটি নালার গভীরতা ও প্রস্থ বাড়ানোর কাজ হয়েছিল। ফলে সেখানে ট্যাঙ্কারের ওপর নির্ভরতা কমে এবং চাষের জন্য জল পাওয়া সম্ভব হয়। ফাউন্ডেশন প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার যন্ত্রপাতিও দিয়েছিল।

আর একটি ঘটনা নানা পাটেকরের চরিত্রটা খুব সুন্দরভাবে প্রকাশ করে। একবার কয়েকজন তাঁকে একটি দামি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার পরামর্শ দেন। তখন তিনি স্টার। অনেকে বললেন, যা নাম করেছো, তাতে তোমাকে ওইরকম একটা গাড়িতেই মানায়।

নানা সেদিন শুধু হেসেছিলেন। খোঁজ নিলেন একটা বিলাসবহুল গাড়ির দাম কত। তারপর সেই টাকাটা কৃষকদের কাজে ব্যবহার করলেন। এই ঘটনাটি পরবর্তীকালে তাঁর সমাজসেবার প্রতীক হয়ে ওঠে। এভাবে নীরবে সমাজসেবার কাজ করে গিয়েছেন সারা জীবন। রাজনৈতিক নেতাদের মতো অন্যের পয়সায় বস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রেস ও ফোটোগ্রাফারদের কখনও টেনে নিয়ে যাননি। তাঁদের মতো আত্মজাহিরের মানসিকতা তাঁর ছিল না।

তবে নানা পাটেকরের সবচেয়ে বড় ব্যাপার বোধহয় টাকা দেওয়া নয়। তিনি দূরত্বটা মুছে দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি তারকার পোশাক খুলে রাখতেন। কৃষকের বাড়িতে গিয়ে তাঁর মাটির দালানে পিঁড়ের ওপর বসে তাঁদের কথা শুনেছেন। সমস্যার কথা বুঝতে চেয়েছেন। তাঁর কাজের একটা বড় অংশ ছিল প্রচারের বাইরে। আজ ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর হিসাব অনুযায়ী, কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে।

নানা পাটেকরের জীবন তাই কেবল একজন সফল অভিনেতার গল্প নয়। বরং একজন মানুষের গল্প, যিনি অভাব ভুলে যাননি সাফল্যের পরেও। যে মানুষ ছোটবেলায় রুটির মূল্য বুঝেছে, সে হয়তো সারাজীবন খাবারের প্লেটের দিকে অন্য চোখে তাকায়। যে মাটির কাছ থেকে উঠে এসেছে, সে হয়তো মাটির মানুষের কষ্টকেও একটু বেশি বুঝতে পারে।

চ্যাপলিন তাঁর সিনেমায় হাসির আড়ালে ক্ষুধার কথা বলেছিলেন। নানা পাটেকর তাঁর জীবনে অভিনয়ের বাইরেও সেই ক্ষুধার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। একজন ক্যামেরার সামনে মানুষের দারিদ্র্যকে শিল্পে পরিণত করেছিলেন। অন্যজন ক্যামেরার বাইরে মানুষের দুঃখের পাশে সমব্যথী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

দু’জনের জীবন আলাদা। কিন্তু তাঁদের ভিতরের মানুষটির কাছে হয়তো সত্যিটা একই ছিল— মানুষের প্রথম পরিচয় তারকা নয়, মানুষ। আর মানুষের প্রথম প্রয়োজন, এক টুকরো রুটি। এখানেই মনে পড়ে শতবর্ষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথা, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, / পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ এই তত্ত্বকেই জীবন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন চ্যাপলিন ও নানা পাটেকর।

প্রতিবেদন

Sandipan Saha