বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

কলকাতা যেন জতুগৃহ ! নিউমার্কেট-কাণ্ডের জেরে কোপ পড়ল ১৩টি হোটেল-পানশালার উপরে

20 August, 2026 7:18 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদন : নিউ মার্কেট লাগোয়া মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ঘিঞ্জি গেস্ট হাউসে ভস্মীভূত হয়ে ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর অবশেষে ঘুম ভাঙল প্রশাসন ও দমকল বিভাগের। অসংলগ্ন নির্মাণ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাব এবং জরুরি বেরোনোর পথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো মারাত্মক গাফিলতির জেরে জীবন গেল ৯ জন নিরপরাধ মানুষের, যার মধ্যে ৮ জনই ওপার বাংলার অর্থাৎ বাংলাদেশের নাগরিক! এই ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডির পর শহরের গেস্ট হাউস ও রেস্তরাঁগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ওঠা বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে চরম কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্য দমকল বিভাগ।

মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকার মোট ৯টি গেস্ট হাউস এবং ৪টি রেস্তরাঁ-কাম-পানশালাকে সরাসরি শোকজ নোটিস পাঠাল দমকল। দমকল আইনের ৩৭-এ ধারায় পাঠানো এই নোটিসে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সংক্রান্ত যাবতীয় নথি ও সুরক্ষা ব্যবস্থার বিবরণ জমা দেওয়ার জন্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সূত্র মারফৎ জানা গিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে দেওয়া জবাব বা সুরক্ষা ব্যবস্থা সন্তোষজনক না মনে হলে ওই ১৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৎক্ষণাৎ বন্ধ ও সিল করে দেবে দমকল বিভাগ।

জরুরি পথ বন্ধ করে পাঁচিল! জতুগৃহে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ৯ জনের মৃত্যু

বুধবার সকালে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ নামের ওই গেস্ট হাউসে আগুন লাগার পর দেখা যায়, ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচার মতো ন্যূনতম পরিকাঠামো সেখানে ছিল না। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থেকে শুরু করে আপৎকালীন সতর্কবার্তা—সবটাই ছিল কাগুজে। সবথেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিপজ্জনকভাবে বহুতলটির পেছনে থাকা জরুরি ভিত্তিতে বেরোনোর পথ অর্থাৎ ‘এমারজেন্সি এক্সিট’টি পাকা পাঁচিল তুলে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল! ফলে আগুন লাগার পর ঘরের ভেতরে থাকা আবাসিকেরা চাইলেও আর বেরোতে পারেননি। আগুনের শিখার চেয়েও বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় চারদিক ভরে যাওয়ায় বিছানায়, মেঝেতে এমনকি শৌচালয়ে কার্যত শ্বাসরুদ্ধ হয়ে একে একে মারা যান ৯ জন।

শনাক্ত বাকি দুই মৃতদেহের পরিচয়: ওপার বাংলা থেকে আসা একই পরিবারের করুণ পরিণতি

এদিকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার গলদের পাশাপাশি বৃহস্পতিবার শেষ হলো মৃতদের শনাক্তকরণের কাজও। বুধবারে চিহ্নিত সাতজনের পাশাপাশি বৃহস্পতিবার আরও দু’জনের পরিচয় সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। নিহত সেই দু’জন হলেন বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী ব্যবসায়ী এসএম আলিমুজ্জামান এবং রেবতী সরকার।

কলকাতাস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের কাছে থাকা নথি, হোটেলের রেজিস্টার ও পাসপোর্ট নম্বর মিলিয়ে দেখে কলকাতা পুলিশ তাঁদের পরিচয় সুনিশ্চিত করেছে। আলিমুজ্জামানের ভাগ্নি জানিয়েছেন, তাঁর মামা চিকিৎসার তাগিদে কলকাতায় এসে নিউ মার্কেটের এই গেস্ট হাউসে উঠেছিলেন।

এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে মৃত ৯ জনের মধ্যে ৮ জনই বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কিংবা ঘুরে দেখতে কলকাতায় এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ওপার বাংলার তরুণ সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত (৩৯), তাঁর পরিবারের সদস্য আক্রম আলি (৭৪), আফসানা শারমীন (২৭) এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা মাত্র ২ বছর ৮ মাস বয়সের শিশু স্বর্ণশীষ দত্ত। এছাড়া বাবু আহমেদ (৩৭) নামের আরও এক বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণ গিয়েছে এই ট্র্যাজেডিতে।

এক লহমায় একটি বহুতল আবাসন কীভাবে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে, মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই মর্মান্তিক ঘটনা তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিল। বেআইনি নির্মাণ ও নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর কঠোর নজরদারি না চললে, তিলোত্তমায় এমন জতুগৃহের পুনরাবৃত্তি রোখা যে দুঃসাধ্য—তা মানছেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলও।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee