বনেদি বাড়ির পুজো: ঐশ্বর্য, সাহেবিয়ানা আর হারিয়ে যাওয়া কলকাতার গল্প
লিখেছেন শীর্ষেন্দু সমাদ্দার
কলকাতার দুর্গাপুজো মানে শুধু আলোর রোশনাই, মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ঢল কিংবা বারোয়ারি পুজোর বিপুল আয়োজন নয়। এই শহরের পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বনেদি বাড়ির উঠোন, জমিদারির দাপট, ব্যবসায়ীদের প্রতিপত্তি, ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে ওঠাবসা, নাচগানের আসর আর এক বিস্মৃত কলকাতার সংস্কৃতি। যে কলকাতা একদিন দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে নিজের সামাজিক প্রতিষ্ঠা জাহির করত, সেই কলকাতারই অনেক স্মৃতি আজও বেঁচে আছে উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়িগুলির ঠাকুরদালানে।
বনেদি বাড়ির পুজো ছিল এক অর্থে ধর্মীয় উৎসব, অন্য অর্থে সামাজিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ। আঠারো ও উনিশ শতকে কলকাতা যখন ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে, তখন এক শ্রেণির বাঙালি জমিদার, ব্যবসায়ী, রাজস্ব আদায়কারী এবং কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ধনী ব্যক্তি বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়ে ওঠেন। তাঁদের অনেকের কাছে দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে আভিজাত্য প্রকাশের বড় উপলক্ষ।
ইংরেজদের সঙ্গে সখ্যও এই পুজোগুলির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। সাহেবদের নিমন্ত্রণ করা, তাঁদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা, নাচ-গানের আসরে বসানো— এসবের মধ্যে ছিল সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। আবার ইংরেজদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সব পরিবারের ক্ষেত্রে এক রকম ছিল না। কারও কাছে তা ছিল ব্যবসায়িক সম্পর্কের সম্প্রসারণ, কারও কাছে প্রশাসনিক যোগাযোগ, কারও কাছে নিছক সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। ফলে দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছিল দেশীয় অভিজাত সমাজ ও ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর যোগাযোগের একটি দৃশ্যমান পরিসর।
কলকাতার ইতিহাসে শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নবকৃষ্ণ দেবের পুজোকে ঘিরে সাহেব-সুবোদের উপস্থিতি এবং জাঁকজমকের যে বিবরণ প্রচলিত রয়েছে, তা আজও শহরের পুজোর ইতিহাসে আলোচিত। তবে বনেদি বাড়ির পুজোকে শুধু ইংরেজদের খুশি করার আয়োজন বলে দেখলে তার সম্পূর্ণ ইতিহাস ধরা পড়ে না। এর মধ্যে ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং নিজেদের আভিজাত্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। সব মিলিয়ে এক জটিল সময়ের ছবি।
* ঠাকুরদালানে দেবী, পাশের মহলে নাচের আসর
বনেদি বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটি আকর্ষণ ছিল নাচগানের আসর। পুজোর দিনগুলিতে বাড়ির ঠাকুরদালানে চলত দেবীর আরাধনা, আর অন্য প্রান্তে বসত বিনোদনের আসর। কলকাতার ধনী পরিবারগুলির কয়েকটি পুজোয় উত্তর ভারতের শিল্পীদের, বিশেষত লখনউয়ের বাঈজিদের নাচগানের আসর বসত। শোভাবাজার রাজবাড়ির ইতিহাসে এমন আসরের উল্লেখ রয়েছে। ইউরোপীয় অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য এই আয়োজন ছিল সেই সময়ের অভিজাত সংস্কৃতির একটি পরিচিত দিক।
সেই আসরে থাকত ধ্রুপদী সংগীত, ঠুমরি, দাদরা কিংবা কত্থক নৃত্যের মতো পরিবেশনা। তবে সব বাড়ির পুজোয় এমন আসর বসত না। আবার সব শিল্পীর পরিচয়ও এক ছিল না। বনেদি বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল বহুবর্ণ। কোথাও নাচগানের আসর, কোথাও যাত্রা বা কবিগান, কোথাও আবার আত্মীয়স্বজন ও আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে দীর্ঘ আড্ডা। ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে বিনোদন ও আতিথেয়তার এমন মেলবন্ধন আজকের সময়ে কল্পনা করাও কঠিন।
* ভিয়েনের গন্ধে উৎসবের বাড়ি
বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই ছিল রান্নার বিপুল আয়োজন। অনেক বাড়িতে পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। বাড়ির অন্দরমহল ব্যস্ত হয়ে উঠত চাল-ডাল, ঘি, মশলা, সবজি, মাছ-মাংস এবং মিষ্টির আয়োজন নিয়ে। কোথাও বাড়ির নিজস্ব রাঁধুনিরা, কোথাও পেশাদার পাচক ও সহকারীদের নিয়ে চলত রান্না।
এই বিশেষ রান্নার আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘ভিয়েন’ বসার ঐতিহ্য। পুজোর ভোগ, অতিথি আপ্যায়ন এবং পরিবারের সদস্যদের খাওয়ানোর জন্য তৈরি হতো নানা পদ। কোথাও নিরামিষ ভোগের প্রাধান্য, কোথাও মাছের পদ, কোথাও আবার অতিথিদের জন্য আলাদা ভোজের ব্যবস্থা। বনেদি বাড়ির পুজোর রান্না কেবল পেট ভরানোর বিষয় ছিল না। তা ছিল পরিবারের ঐশ্বর্য, আতিথেয়তা এবং রন্ধনঐতিহ্যের পরিচয়। আজও কিছু বাড়িতে সেই পুরনো রান্নার রীতি টিকে রয়েছে, যদিও আয়োজনের বহর অনেক ক্ষেত্রেই কমেছে।
* বারোয়ারি পুজোর ভিড়ে বনেদিয়ানার নিজস্ব জগৎ
সময়ের সঙ্গে কলকাতার দুর্গাপুজোর চরিত্র বদলেছে। একসময় যে উৎসব মূলত রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি ও ধনী পরিবারের অন্দরমহলে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ক্রমে সর্বসাধারণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের গোড়ায় সমবেত উদ্যোগে পুজোর বিস্তার ঘটে। ১৯১০ সালে কলকাতার ভবানীপুরে সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার উদ্যোগে সর্বজনীন পুজোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
তার পর থেকে পুজো আর কেবল বনেদি বাড়ির একচেটিয়া উৎসব থাকেনি। পাড়ার ক্লাব, সর্বজনীন কমিটি এবং বারোয়ারি উদ্যোগ দুর্গাপুজোকে সাধারণ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত করেছে। মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, থিম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান— সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো আজ এক বিশাল জনউৎসব।
কিন্তু এই পরিবর্তনের আড়ালে হারিয়ে যায়নি বনেদি বাড়ির পুজো। শোভাবাজার রাজবাড়ি, সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো, জানবাজারের রানি রাসমণির বাড়ির ঐতিহ্য কিংবা উত্তর কলকাতার বিভিন্ন প্রাচীন পরিবারের পুজো আজও নিজেদের মতো করে টিকে রয়েছে।
তবে তাদের অস্তিত্ব আর আগের মতো সামাজিক প্রতিপত্তির প্রতীক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এখন তা পারিবারিক দায়বদ্ধতা, উত্তরাধিকার রক্ষা এবং শহরের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। পুরনো ঠাকুরদালানের দেওয়ালে সময়ের দাগ, ভেঙে পড়া নাচঘর, বিবর্ণ স্তম্ভ কিংবা বহু ব্যবহারে ক্ষয়ে যাওয়া মেঝে— এসবের মধ্যেও লুকিয়ে আছে একসময়ের কলকাতার স্মৃতি।
আজকের কলকাতার দুর্গাপুজোয় মানুষের ঢল, কর্পোরেট স্পনসরশিপ, কোটি টাকার মণ্ডপ এবং পুরস্কারের প্রতিযোগিতা চোখে পড়ে। অন্যদিকে, বনেদি বাড়ির পুজোয় এখনও দেখা যায় একচালার প্রতিমা, পুরনো ঠাকুরদালান, পারিবারিক নিয়ম, নির্দিষ্ট ভোগ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা আচার। সেখানে উৎসবের জাঁকজমকের চেয়ে ইতিহাসের উপস্থিতি অনেক বেশি অনুভব করা যায়।
একসময় যে বাড়িগুলিতে সাহেবদের আগমন ছিল মর্যাদার বিষয়, যেখানে নাচঘরে রাতভর বসত আসর, যেখানে ভিয়েনের রান্নায় মেতে উঠত গোটা পরিবার, সেই বাড়িগুলির অনেকগুলিই আজ অন্য বাস্তবতার মুখোমুখি। পরিবারের সদস্য ছড়িয়ে পড়েছেন নানা জায়গায়। বিপুল ব্যয়ের ভার বহন করা কঠিন হয়েছে। পুরনো বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণও সহজ নয়। তবু নিয়ম মেনে পুজো হয়। পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং দেবীর আরাধনাকে ঘিরে পরিবারের মানুষ ফিরে আসেন এক উঠোনে।
এই পুজোগুলির দিকে তাকালে কলকাতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ঐতিহ্য কি শুধু কোনও প্রাচীন প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখার নাম, নাকি সেই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়, সমাজ ও সংস্কৃতিকেও বুঝে নেওয়া? বনেদি বাড়ির পুজোয় যেমন ভক্তি রয়েছে, তেমনই রয়েছে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের ইতিহাস। যেমন রয়েছে আভিজাত্যের প্রদর্শন, তেমনই রয়েছে সংগীত, রান্না, শিল্প এবং পারিবারিক জীবনের বিবর্তন।
বারোয়ারি পুজোর বিপুল আয়োজনের মধ্যে বনেদি বাড়ির পুজো হয়তো আজ অনেকটাই আড়ালে। কিন্তু সেই আড়ালেই তারা ধরে রেখেছে কলকাতার অন্য এক পরিচয়। যে পরিচয় শুধু উৎসবের নয়, একটি শহরের জন্ম, উত্থান, সামাজিক পরিবর্তন এবং স্মৃতির।
মণ্ডপের আলো নিভে যায়, থিমের কাঠামো খুলে ফেলা হয়। কিন্তু বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে থেকে যায় সময়ের ছাপ। সেখানে দেবী দুর্গা শুধু পূজিত হন না, তিনি সাক্ষী থাকেন কয়েক শতকের কলকাতার— তার সম্পদ, তার সাহেবিয়ানা, তার সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য এবং তার ক্রমশ বদলে যাওয়ার ইতিহাসের।
