যথাযথ মর্যাদায় রাজ্যজুড়ে করম পরব উদযাপন
সংবাদদাতা,মালদহ: ভাদ্র মাসের শুক্ল একাদশী তিথিতে বামনগোলা থানার অন্তর্গত ডাকাতপুকুর গ্রামে সাড়ম্বরে পালিত হল কুড়মি সমাজের অন্যতম প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘করম পরব’। প্রকৃতি পূজা, ভাই-বোনের পবিত্র প্রেম এবং সুফসলের কামনায় আয়োজিত এই উৎসবে আনন্দের জোয়ারে ভেসেছেন ডাকাতপুকুর গ্রাম সহ আশপাশের অঞ্চলের কুড়মি সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ। ঐতিহ্যগত নিয়ম ও লোকাচারকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে দিনটি ঘিরে গ্রামজুড়ে ছিল উৎসব মুখর পরিবেশ।
উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল ‘করম রাজা’ বা করম গাছের ডালকে কেন্দ্র করে পরিচালিত নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠান। প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শুক্ল একাদশীর শুভ লগ্নে গ্রামের যুবকেরা উপবাস থেকে জঙ্গল বা নির্দিষ্ট স্থান থেকে ভক্তিসহকারে করম গাছের ডাল কেটে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তা ডাকাতপুকুর গ্রামের নির্ধারিত থান বা আখড়ায় নিয়মমাফিক তা স্থাপন করা হয়। করম ডালকে দেবতারূপে আবাহন করে ফল, ফুল, আতপ চাল এবং বিশেষ ভাবে অঙ্কুরিত শস্য বা ‘জাওয়া’ দিয়ে পূজা আর্চনা করেন কুড়মি মহিলারা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসবের বিশেষ অঙ্গ হল ‘জাওয়া তোলা’। ভাদ্র মাসের শুরুর দিকেই ঘরের মেয়েরা বাঁশের ছোট পাত্রে বা ছাঁচে বালি ও বিভিন্ন ধরনের শস্যের বীজ যেমন ধান, গম, মাষকলাই, মুগ ইত্যাদি দেন। পুজো পর্যন্ত বিশেষ যত্ন নিয়ে সেই বীজ থেকে সবুজ অঙ্কুর তৈরি করা হয়, যাকে কুড়মি ভাষায় ‘জাওয়া’ বলা হয়। এই জাওয়া হল উর্বরতা, সৃষ্টি এবং সমৃদ্ধির প্রতীক। পূজার দিন যুবতী ও বোনেরা তাঁদের ভাইদের দীর্ঘায়ু, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের প্রার্থনা করে এই জাওয়া উৎসর্গ করেন।
আরও পড়ুন: কামতাপুরের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত মুখ্যমন্ত্রী
ডাকাতপুকুর গ্রামের এক পুজো কমিটির সদস্যদের কথায়, করম পরব কেবল একটি সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়,এটি কুড়মি সমাজের মূল পরিচয়, প্রকৃতিপ্রেম এবং লোকসংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। বহু প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিনির্ভর কুড়মি সমাজ প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের মেলবন্ধন ঘটাতে এই উৎসব উদযাপন করে আসছে। করম গাছ ও করম দেবতাকে কেন্দ্র করে সুফসল এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রার্থনা জানানো হয়। সন্ধ্যার পর থেকে ডাকাতপুকুর গ্রামের আখড়ায় ঢাক, মাদল, ধামসা, ঝুমুর গান ও বাঁশির সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে। সুসজ্জিত পোশাকে কুড়মি নারী-পুরুষেরা এক জোট হয়ে হাত ধরাধরি করে করম ডালকে ঘিরে ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নাচে মেতে ওঠেন। সারারাত ধরে চলে নাচ, গান এবং পৌরাণিক লোকগাথার পরিবেশন।
