কর্ণ ও অর্জুনের শত্রুতা কি শুধু মহাভারতের? নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে অন্য এক কাহিনি?
মহাভারতে কর্ণ আর অর্জুন সহোদর ভাই হয়েও চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত। কে বড় যোদ্ধা, এই নিয়ে বহু আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু পদ্মপুরাণ বলছে, তাঁদের এই শত্রুতার শিকড় মহাভারতের অনেক আগে, এমনকি এক পূর্বজন্মেও ছড়িয়ে আছে।
কাহিনির সূচনা হয় ব্রহ্মা আর বিষ্ণুর মধ্যে এক তর্ক দিয়ে — সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষায় কার অবদান বেশি, তা নিয়ে। এই বিতর্ক থামাতে এগিয়ে আসেন মহাদেব। কিন্তু ব্রহ্মা দাবি করে বসেন, সব কিছুর স্রষ্টা তিনিই, তাঁকে ছাড়া বিষ্ণু-মহেশ্বর কারোরই অস্তিত্ব থাকত না। এই কথায় শিব প্রচণ্ড রেগে যান, আর দুজনের মধ্যে তুমুল বচসা শুরু হয়। রাগে ব্রহ্মার কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ে, আর সেই ঘাম থেকে জন্ম নেয় এক ভয়ংকর অসুর — শ্বেতজ, যার শরীরে ছিল হাজারখানা কবচ। ব্রহ্মা তাকে আদেশ দেন শিবকে বধ করে তাঁর অপমানের শোধ নিতে।
সংকট বুঝে বিষ্ণু মহাদেবকে এক উপায় বাতলে দেন — নিজের হাতে আঘাত করে সেই রক্তের সঙ্গে শিবের তেজ মিশিয়ে দিতে বলেন। তা থেকেই জন্ম নেয় আরেক শক্তিশালী অসুর, রক্তজ, যার হাজারখানা হাত। শিব তাকে পাঠান শ্বেতজের মোকাবিলায়।
এরপর শুরু হয় দুই অসুরের দীর্ঘ, ভয়াবহ যুদ্ধ। কেউ কাউকে হারাতে পারে না — রক্তজ শ্বেতজের প্রায় সব কবচ ভেঙে ফেলে, শ্বেতজ কেটে ফেলে রক্তজের প্রায় সব হাত, তবু লড়াই থামে না। শেষে ত্রিদেব বুঝতে পারেন, এই যুদ্ধ চলতে থাকলে সৃষ্টিই ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন — এই দ্বন্দ্বের ফয়সালা হবে পরের জন্মে।
শ্বেতজের পুনর্জন্মের ভার দেওয়া হয় সূর্যদেবকে, আর রক্তজের ভার ইন্দ্রকে। ইন্দ্র প্রথমে রাজি হননি — কারণ তিনি মনে করিয়ে দেন, রামাবতারে বিষ্ণু তাঁর পুত্র বালীকে বধ করেছিলেন। বিষ্ণু তখন আশ্বাস দেন, এবার ইন্দ্রপুত্র রূপে জন্ম নিলে রক্তজই জয়ী হবে।
এভাবেই শ্বেতজ জন্ম নেন কর্ণ হয়ে — কুন্তীর গর্ভে, সূর্যদেবের আশীর্বাদে। আর রক্তজ জন্ম নেন অর্জুন হয়ে — ইন্দ্রদেবের পুত্র রূপে। মহাভারতে যতবারই কর্ণ-অর্জুন মুখোমুখি হয়েছেন, প্রতিবারই কর্ণ হেরেছেন, আর শেষমেশ কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের হাতেই কর্ণের মৃত্যু হয় — জন্ম জন্মান্তরের সেই শত্রুতার অবসান ঘটে। প্রতিটি পর্বেই দেখা যায় বিষ্ণুর বিশেষ কূটকৌশল আর ভূমিকা।
