বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

দেহদান প্রশ্নে কার্যত সুর নরম স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতের !

29 August, 2026 6:22 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

কলকাতা: প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দেহদান প্রসঙ্গ টেনে এনে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ার পর অবশেষে সুর বদলালেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। ‘মরণোত্তর দেহদানের কোনো উপযোগিতা নেই’, এমনি মন্তব্যের জেরে রাজ্যজুড়ে ছড়ানো বিতর্কের প্রেক্ষিতে শনিবার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাফ দাবি, তাঁর বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি কখনোই স্বাভাবিক মৃত্যুর পর দেহদান বন্ধের কথা বলেননি; বরং যাঁদের মস্তিষ্কের মৃত্যু বা ‘ব্রেন ডেথ’ ঘটে, তাঁদের ক্ষেত্রে স্রেফ পুরো দেহদান না করে জীবনদায়ী অঙ্গদানে জোর দেওয়ার কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন।

শনিবার যাদবপুরের কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে প্লাস্টিক সার্জারি বিষয়ক একটি জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের আগের মন্তব্যের বিশদ ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, “আমি বলেছিলাম, যাঁদের মস্তিষ্কের মৃত্যু (ব্রেন ডেথ) হয়েছে কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়নি, তাঁদের পরিবার যেন শুধু পুরো দেহদানে আটকে না থাকেন। সে ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অঙ্গদান (অর্গান ডোনেশন)। কারণ ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে রোগীর অঙ্গগুলো সচল থাকে, যা অন্য বহু মুমূর্ষু মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে।”

শারদ্বতবাবু আরও স্পষ্ট করে বলেন, “অনেক সময় রোগীর ব্রেন ডেথ হলে অঙ্গদানের আর্জি জানালে পরিজনেরা বলেন, উনি তো আগে থেকেই পুরো দেহদানের অঙ্গীকার করে রেখেছেন। আমি ঠিক এই জায়গাটিতেই সচেতন করতে চেয়েছিলাম। ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে পুরো দেহ না রেখে অঙ্গদান করাটাই পরম জরুরি। অন্যদিকে, যাঁদের স্বাভাবিক বা বার্ধক্যজনিত মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের অঙ্গ আর অন্য কারো শরীরে প্রতিস্থাপনের উপযুক্ত থাকে না। ফলে স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে অঙ্গদানের কোনও মূল্য নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে মেডিক্যাল পড়ুয়াদের অ্যানাটমি ও গবেষণার জন্য মরণোত্তর দেহদানই একমাত্র পথ। এই দুটো বিষয় নিয়ে কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমি কখনোই বলিনি যে দেহদানের প্রয়োজন নেই।”

বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সেখানে সিপিআইএমের প্রয়াত শীর্ষ নেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেছিলেন, “গোটা দেহ কেউ দান করবেন না, তাতে বিশেষ কাজ হয় না। জ্যোতি বসুর দেহ যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো কাজে লাগেনি। তার চেয়ে অঙ্গদান অনেক বেশি কার্যকর।”

প্রবীণ পলিটব্যুরো নেতার দেহদান নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিশেষ করে যাঁরা ইতিপূর্বে মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গিকার পত্রে স্বাক্ষর করে রেখেছেন, তাঁদের মনে গভীর সংশয় ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন ওঠে, তবে কি স্বাভাবিক মৃত্যুর পর দান করা শরীর চিকিৎসাবিজ্ঞানের অ্যানাটমি গবেষণায় আর কোনো কাজেই আসে না?

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর শনিবারের এই ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা সাফাইকেও অবশ্য পুরোপুরি মেনে নিতে নারাজ দেহদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি। দীর্ঘ দিন ধরে মরণোত্তর দেহ ও অঙ্গদান নিয়ে কাজ করা ‘গণদর্পণ’-এর সম্পাদক সুদীপ্ত সাহা রায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, “ব্রেন ডেথ হওয়া রোগীদের পরিবার যাতে অঙ্গদানে এগিয়ে আসেন, সেই সচেতনতা প্রচার তো আমরা বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে আসছি। কিন্তু সেই বৈজ্ঞানিক সত্য বোঝাতে গিয়ে ১৭ বছর পর জ্যোতি বসুর ঐতিহাসিক দেহদানের প্রসঙ্গ তুলে এনে তাকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রতিপন্ন করার তো কোনো দরকার ছিল না! এখন চারদিক থেকে সমালোচনা ও চাপের মুখে পড়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অন্য বয়ান দিচ্ছেন এবং কথার ভুল ব্যাখ্যা করার অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন।”

চিকিৎসাজগতের একাংশের মতে, ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে কিডনি, লিভার, হৃদপিণ্ড বা চোখ প্রতিস্থাপন করে নতুন জীবন দেওয়া সম্ভব—এ কথা যেমন ঠিক, তেমনই মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়াদের অ্যানাটমি শিক্ষা ও অস্ত্রোপচারের অভিজ্ঞতার জন্য স্বাভাবিক মৃতদেহের ক্যাডাভেরিক প্রয়োজনীয়তাও অপরিসীম। মন্ত্রী ভুল স্বীকার না করলেও তাঁর শনিবারের এই স্পষ্টীকরণে অন্তত সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি কিছুটা হলেও দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee