বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর ক্ষোভের আগুন! পারেদেস-মোলিনার উপর কড়া শাস্তি ফিফার

22 August, 2026 4:50 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

জুরিখ : ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর মাঠে যে হট্টগোল ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, তার জেরে এবার আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) এবং তাদের কয়েকজন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের ওপর ফিফা কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি লিয়ানদ্রো পারেদেসকে ১০ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তার সতীর্থ নাহুয়েল মোলিনা পেয়েছেন সাত ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা। এছাড়া আর্জেন্টিনাকে পরবর্তী দুটি হোম ম্যাচ ৫০ শতাংশ দর্শক নিয়ে খেলতে হবে, যদিও এর একটি ম্যাচের শাস্তি স্থগিত রাখা হয়েছে। এএফএ-কে মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ডলার (প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার পাউন্ড) জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ডলার বৈষম্যবিরোধী কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করতে হবে এবং আরও ১ লাখ ডলার স্থগিত রাখা হয়েছে, যার সঙ্গে প্রবেশন পিরিয়ড যুক্ত থাকবে।

ফাইনাল শেষ হওয়ার পর নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে যে দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তা ফুটবলপ্রেমীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে পরাজয়ের বেদনা খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। পারেদেস স্পেনের এরিক গার্সিয়াকে গলা চেপে ধরেছিলেন এবং গাভিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার মুখে আঘাত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ।

গাভি অবশ্য বলেছেন, তিনি মনে করেন না পারেদেসকে শাস্তি দেওয়া উচিত। তবুও গাভিকেও এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা ও ৩০ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছে। একই শাস্তি পেয়েছেন আর্জেন্টিনার থিয়াগো আলমাদা। আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফের সদস্য রবার্তো আয়ালা স্পেনের দানি ওলমোর মুখে আঘাত করার অভিযোগে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা ও ৩০ হাজার ডলার জরিমানা পেয়েছেন। পারেদেস ও মোলিনা প্রত্যেকে ৯০ হাজার ডলার করে জরিমানা দেবেন। সব নিষেধাজ্ঞা শুধু আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রযোজ্য হবে।

এই শাস্তির পেছনে আরও একটি ঘটনাও জড়িয়ে আছে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর কয়েকজন আর্জেন্টিনা খেলোয়াড় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের (আর্জেন্টিনার দাবি অনুযায়ী মালভিনাস) সার্বভৌমত্ব দাবি করে একটি ব্যানার তুলে ধরেছিলেন। ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের দাবি জানা। ফিফা এটিকে খেলাধুলার বাইরের প্রদর্শনী এবং অ-ক্রীড়াগত প্রকৃতির ব্যবহার হিসেবে দেখেছে। এছাড়া দলীয় অসদাচরণ এবং সমর্থকদের বৈষম্যমূলক স্লোগান ও অঙ্গভঙ্গির অভিযোগও আনা হয়েছে।

ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোড লঙ্ঘনের জন্যই এই জরিমানা ও শাস্তির সিদ্ধান্ত।ফিফা গত মাসেই ফাইনালের পরের ঘটনা তদন্তের জন্য একজন ডিসিপ্লিনারি ও এথিক্স প্রসিকিউটর নিয়োগ করেছিল। তদন্ত শেষে এখন এই সিদ্ধান্ত এসেছে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যেই বলেছে, তারা এই শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করবে। আপিল ব্যর্থ হলে তারা কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টস (ক্যাস)-এ যাবে। আর্জেন্টিনার সমর্থক ও খেলোয়াড়দের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, পরাজয়ের মুহূর্তে আবেগের বশবর্তী হয়ে যা ঘটেছে, তার শাস্তি কিছুটা কঠোর হয়েছে।

অন্যদিকে ফিফা স্পষ্ট করেছে, খেলার মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।এই ঘটনা শুধু আর্জেন্টিনার জন্যই নয়, বিশ্ব ফুটবলের জন্যও একটি বার্তা। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষা আবারও সামনে এসেছে। পারেদেসের ১০ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা মানে আগামী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে তিনি বাদ পড়বেন। মোলিনার সাত ম্যাচের শাস্তিও দলের ডিফেন্সিভ ব্যালেন্সে প্রভাব ফেলতে পারে। হোম ম্যাচে দর্শক সংখ্যা অর্ধেক করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবেও আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলবে।

জরিমানার অর্থের একটি অংশ বৈষম্যবিরোধী পরিকল্পনায় খরচ করতে হবে—এটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে ফকল্যান্ড/মালভিনাস ইস্যু নিয়ে সংবেদনশীলতা দীর্ঘদিন ধরেই আছে। সেমিফাইনালের পর ব্যানার উত্তোলন সেই আবেগেরই প্রকাশ ছিল। কিন্তু ফিফার নিয়ম অনুযায়ী ক্রীড়া ইভেন্টকে রাজনৈতিক প্রদর্শনীর মঞ্চ বানানো যায় না। সেই কারণেই অ্যাসোসিয়েশনকে জরিমানা করা হয়েছে। সমর্থকদের বৈষম্যমূলক স্লোগান ও অঙ্গভঙ্গিও শাস্তির আওতায় এসেছে। ফিফা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—বৈষম্য কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

এই শাস্তির পর আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়দের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তারা কীভাবে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন এবং আগামী ম্যাচগুলোতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। গাভির মন্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, পারেদেসকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন। এটি দেখায়, সংঘর্ষের পরও খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানের জায়গা রয়ে গেছে। তবে ফিফার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং নিয়ম অনুযায়ীই নেওয়া হয়েছে।বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন শাস্তির নজির আগেও আছে। খেলোয়াড়দের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ম্যাচ শেষে শান্তভাবে মাঠ ছাড়ার গুরুত্ব বারবার জোর দেওয়া হয়েছে।

এবারের ঘটনা সেই শিক্ষাকে আরও জোরালো করেছে। আর্জেন্টিনা যদি আপিল করে এবং ক্যাস-এ যায়, তাহলে সেখানেও এই বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচিত হবে। আপাতত শাস্তি বহাল থাকলে পারেদেস ও মোলিনা দলের জন্য বড় ধাক্কা হবে।এএফএ-র জরিমানার একটি অংশ স্থগিত রাখা হয়েছে এবং প্রবেশন পিরিয়ড আরোপ করা হয়েছে। এর মানে, ভবিষ্যতে একই ধরনের লঙ্ঘন হলে স্থগিত অংশও কার্যকর হতে পারে। বৈষম্যবিরোধী পরিকল্পনায় অর্থ বিনিয়োগের নির্দেশ ফিফার ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এটি শুধু শাস্তি নয়, শিক্ষারও একটি পথ।সার্বিকভাবে, ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের এই ঘটনা ফুটবল বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে জয়-পরাজয়ের বাইরেও খেলার মর্যাদা ও শৃঙ্খলা অপরিহার্য। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকদের এখন শান্ত হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবতে হবে। ফিফার এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব ফুটবলে শৃঙ্খলা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হবে। আগামী দিনগুলোতে আপিলের ফলাফল এবং আর্জেন্টিনার প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে এই অধ্যায় কীভাবে শেষ হয়।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee