ইস্টবেঙ্গলের উচ্ছ্বাসে উত্তাল ময়দান, লাল-হলুদ তাঁবুতে জনজোয়ার
নিজস্ব প্রতিবেদন : অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!
দীর্ঘ ২২ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে হারিয়ে ডুরান্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন হল ইস্টবেঙ্গল। আর এই ঐতিহাসিক জয়ের পর থেকেই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভাসছে সমগ্র লাল-হলুদ শিবির। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন থেকে যে বাঁধভাঙা উৎসবের সূচনা হয়েছিল, সোমবারও তার রেশ বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং শতগুণ বেড়ে প্রদীপের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ময়দানে।
লেসলি ক্লডিয়াস সরণির ইস্টবেঙ্গল ক্লাব তাঁবু এখন যেন উৎসবের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ডুরান্ড ট্রফি দেখার জন্য ক্লাবে উপচে পড়ছে সদস্য ও সাধারণ সমর্থকদের থিকথিকে ভিড়। এই আনন্দের আবহেই সোমবার সকাল ১০টায় ক্লাব তাঁবুতে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন ক্লাব সভাপতি মুরারীলাল লোহিয়া, শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকারসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে লাল-হলুদ ব্রিগেডকে শুভেচ্ছা জানান রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়।
গ্রুপ পর্বে এই মোহনবাগানের কাছেই হার স্বীকার করতে হয়েছিল লাল-হলুদ ব্রিগেডকে। ফলে ফাইনালে মলিনা বা হাবাস বাহিনীর সামনে ছিল এক কঠিন বদলার মঞ্চ। কিন্তু শনিবার যুবভারতীর মেগা ফাইনালে যা ঘটল, তা হয়তো কোনো ইস্টবেঙ্গল সমর্থক স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি!
ম্যাচের শুরু থেকেই মোহনবাগানকে কার্যত কোণঠাসা করে ফেলে মশাল বাহিনী। বিশেষ করে তারকা ফরোয়ার্ড এডমুন্ড লালরিনডিকার একের পর এক বিধ্বংসী আক্রমণ গুঁড়িয়ে দেয় সবুজ-মেরুন রক্ষণভাগকে। প্রথমার্ধেই স্বপ্নের হ্যাটট্রিক করে ফেলেন এডমুন্ড! বিরতির আগেই ৪-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলে ইস্টবেঙ্গল। দ্বিতীয়ার্ধে লাল-হলুদে ঝড় সামলাতে ব্যর্থ হয় বিপক্ষ। বলা চলে, প্রথমার্ধেই জয়ের দেওয়াল লিখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই দুর্দান্ত জয়ের মাধ্যমে ইস্টবেঙ্গল শুধু ট্রফিই জিতল না, ডুরান্ড জয়ের নিরিখে ১৭ বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে ছুঁয়ে ফেলল মোহনবাগানকেও।
ডুরান্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের এই ঐতিহাসিক জয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন স্বয়ং দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করার পর তিনি সমাজমাধ্যমে লেখেন, “কলকাতায় ডুরান্ড কাপের ফাইনাল দেখলাম। ট্রফি জেতার জন্য ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে অভিনন্দন।” আলাদা করে তরুণ তুর্কি এডমুন্ডের ভূয়সী প্রশংসাও করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
অন্যদিকে, ট্রফি হাতে পাওয়ার পর টিম হোটেলে পৌঁছে কেক কেটে ও উদ্দাম নাচে জয়ের উল্লাসে মেতে ওঠেন ইস্টবেঙ্গল ফুটবলার ও কোচিং স্টাফেরা।
ক্লাব তাঁবুতে এক সাংবাদিক বৈঠকে ইস্টবেঙ্গলের প্রভাবশালী কর্তা দেবব্রত সরকার আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “দেশের সম্মান রক্ষা করতে আমরাই পারি, সেটা মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে আমরা আবারও প্রমাণ করে দিলাম।” পাশাপাশি ট্রফি লাল-হলুদ ক্লাবেই সগৌরবে রাখা থাকবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন, “ম্যাচ দেখতে এসে আমাদের সমর্থকদের ওপর কোনো আক্রমণ বরদাস্ত করা হবে না। সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা যতদূর যেতে হয় ততদূর যাব।” ক্লাবের প্রাক্তন ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর সহযোগিতার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, পূর্বে শ্রী সিমেন্ট বা বর্তমানে ইমামি—সব ক্ষেত্রেই রাজ্য সরকার পাশে থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
তবে ডুরান্ড জিতেও আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নারাজ লাল-হলুদ ব্রিগেড। দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য তারকা মহম্মদ রশিদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আমাদের কাজ এখনও শেষ হয়নি। আসল লক্ষ্য আরও দূরে।” রশিদ ও অগুণতি সমর্থকদের চোখ এখন আগামী টুর্নামেন্টগুলোর দিকে। ২২ বছর পর ডুরান্ড জয় যে ইস্টবেঙ্গলের এক নতুন যুগের সূচনা করল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই!
