বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

নেপালের বিপর্যয়ে আগাম সতর্কতার খবর চেপে যাওয়ার অভিযোগ চিনের বিরুদ্ধে

27 August, 2026 3:29 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

কাঠমান্ডু : তিব্বতে সৃষ্ট বিধ্বংসী হড়পা বান এবং নদী উপচে আসা প্রলয়ঙ্কারী পাহাড়ি ঢলে এক “নজিরবিহীন বিপর্যয়”-এর মুখে পড়েছে নেপাল। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০০  জনের প্রাণহানি ঘটেছে, গৃহহীন বহু মানুষ। কিন্তু দুর্যোগের ভয়াবহতাকে ছাড়িয়ে এখন কূটনৈতিক ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এক বড় প্রশ্ন— চীন কি ইচ্ছে করেই আগাম সতর্কতা জারি করেনি? আর এখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কেনই বা তারা এই গুরুতর অভিযোগ স্রেফ ‘ভুয়ো’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে ?

সংকটজনক পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঠমান্ডু থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ উদ্ধারকাজে নেমেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, “নেপাল সেনা Rasuwa জেলার Timure থেকে ইতিমধ্যেই ১১৬ জনকে উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে ৯৫ জন নেপালি এবং ২১ জন ভারতীয় নাগরিক।” এছাড়া একটি সুড়ঙ্গে আটকে থাকা ৭ জন নেপালি নাগরিককেও নিরাপদে বের করে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “ভোর সাড় ৬টা থেকে বিমান ও হেলিকপ্টারে উদ্ধারকাজ চলছে। ১৫টিরও বেশি ফ্লাইট চালানো হয়েছে। আশঙ্কাজনক রোগী, বয়স্ক, মহিলা ও শিশুদের বিমানে উদ্ধারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।”

দুর্গত এলাকায় জেনারেটর, অস্থায়ী মোবাইল টাওয়ার, ওষুধ এবং রিলিপ সামগ্রী পাঠানো হলেও আসল ক্ষোভ জমা হচ্ছে নেপালের সাধারণ মানুষ ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে।

কেন আগাম সতর্কতা জারি করল না চিন?

ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং নেপালের একাংশের স্পষ্ট দাবি, চিনের তিব্বত সীমান্ত দিয়ে যে জল নেমে এসেছে, তার প্রাথমিক পূর্বাভাস পাওয়ার পূর্ণ সুযোগ ছিল বেইজিংয়ের কাছে। সীমান্ত এলাকায় চিনের ‘Gyirong Port’ এবং Rasuwagadhi-Gyirong সীমান্ত চৌকি জলস্ফীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তারা ভাটির দেশ নেপালকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা পাঠায়নি।

নেপালের প্রখ্যাত দৈনিক ‘নয়া পত্রিকা’-র এক সাংবাদিক এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, “নেপাল সবসময় প্রতিবেশীদের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে এসেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের উত্তরের প্রতিবেশী দেশ (চীন) আমাদের চরম অবহেলা করেছে। এই বিশাল দুর্যোগের কোনো আগাম সতর্কবার্তা না দেওয়ার ফলেই নেপালকে এতগুলো মানুষের জীবন দিয়ে খেসারত দিতে হলো।”

তথ্য বলছে, তিব্বতের লেক বা নদী উপচে যখন জল নামতে শুরু করে, তখন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নেপালের সীমান্ত এলাকাগুলো প্লাবিত হয়। চীনে আধুনিকতম স্যাটেলাইট ও ওয়েদার মনিটরিং সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও কেন কাঠমান্ডুর জলসম্পদ মন্ত্রণালয় বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলকে কোনো সংকেত পাঠানো হলো না— সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত ও নদী অববাহিকা সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে চিনের এই চরম গাফিলতি ও গোপনীয়তার রাজনীতিই শতাধিক মানুষের মৃত্যুর মূল কারণ।

অভিযোগ অস্বীকার চিনের: কৌশল নাকি পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা?

হঠাৎ করেই এই অভিযোগ চিনের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেওয়ায় তারা তড়িঘড়ি আসরে নেমেছে। বেইজিংয়ের তরফে এখন দাবি করা হচ্ছে যে, “চীন নাকি আগাম সতর্কতা জারি করেনি বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভুয়ো।”

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে কেন এখন চিন একে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়ো বলে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছে?

  • আইনি ও নৈতিক দায় এড়ানো: চিনের সঙ্গে নেপালের সীমান্ত নদী চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক জলবণ্টন নীতি অনুযায়ী উজান বা আপস্ট্রিমের দেশের দায়িত্ব ভাটির দেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া। চীন যদি স্বীকার করে যে তারা পূর্বাভাস দেয়নি, তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের চরম দায়বদ্ধতার মুখে পড়তে হবে।

  • নেপালে চীন-বিরোধী জনমত গঠন আটকানো: নেপালে এই মুহূর্তে চীনের ভারত-বিরোধী ও নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা রয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে চীনের গাফিলতি প্রমাণিত হলে নেপালি জনগণের মধ্যে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ তৈরি হবে।

  • তথ্যের অস্বচ্ছতা ঢাকা দিতে: তিব্বতে চীন যে বাঁধ ও অবকাঠামো তৈরি করছে, তার প্রকৃত তথ্য সবসময়ই গোপন রাখে বেইজিং। সতর্কতা জারি করলে তাদের নিজেদের জলবিদ্যুৎ বা অবকাঠামোগত ক্ষতির তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসত। সেই ভয়েই তারা নীরব ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

একত্রিত নেপাল, উত্তর মেলেনি বেইজিংয়ের আপাতত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য নিয়ে নেপাল এই কঠিন বিপর্যয় মোকাবিলা করছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, ত্রাণ সরবরাহের পাশাপাশি যোগাযোগের জন্য দ্রুত পোর্টেবল মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। তবে তিব্বত থেকে আসা বানের ক্ষতে প্রলেপ লাগলেও, “চিনের নিরবতা কেন কেড়ে নিল ১৭২টি প্রাণ?”— নেপালের এই ক্ষুব্ধ প্রশ্ন কিন্তু বেইজিংয়ের সস্তা সাফাইতে ঢাকা পড়ছে না।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee