বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

বাড়ি ফেরাই কি কাল হল ? বেহালা থেকে গ্রেপ্তার নিউমার্কেটের হোটেল মালিক বীরেশ্বর

22 August, 2026 7:07 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদন : মঙ্গলবার গভীর রাতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন জীবন্ত মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু। মৃতদের তালিকায় সাত জনই প্রতিবেশী বাংলাদেশের নাগরিক। মধ্য কলকাতার জনবহুল নিউ মার্কেট এলাকার হোটেল ‘শিখা-ইন’-এর সেই বিভীষিকাময় দুর্ঘটনার পর থেকেই গা-ঢাকা দিয়েছিলেন হোটেল মালিক বীরেশ্বর মিত্র। নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে চেপে কলকাতা ছেড়ে সোজা পালিয়ে গিয়ে চম্পট দিয়েছিলেন ঝাড়খণ্ডের ধানবাদে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। পুলিশি জালে শেষমেশ বন্দি হলেন তিনি। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার ফলে তীব্র নগদ টাকার সমস্যায় পড়ে বাধ্য হয়ে বেহালার বাড়িতে ফিরতেই লালবাজারের তদন্তকারীদের জালে ধরা পড়লেন পলাতক হোটেল মালিক। শনিবার ডায়মন্ড হারবার রোডের নিজের বাসভবন থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁকে।

কীভাবে ধানবাদে গা-ঢাকা দেন বীরেশ্বর?

পুলিশ ও তদন্তকারী সূত্রের খবর, মঙ্গলবার গভীর রাতে নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিট সংলগ্ন ‘শিখা-ইন’ হোটেলে যখন আগুন লাগে এবং চারদিকে তীব্র আতঙ্ক ও হাহাকার শুরু হয়, ঠিক সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে চম্পট দেন মালিক বীরেশ্বর মিত্র। তিনি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নিজের গাড়িতে চেপে রাজ্য সীমানা পেরিয়ে সোজা ঝাড়খণ্ডের ধানবাদে পৌঁছে যান। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ধানবাদে বীরেশ্বরের একাধিক হোটেলের কর্মচারী ও বিশ্বস্ত পরিচিতদের বাড়ি রয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের চোখ এড়িয়ে সেই কর্মচারীদের আশ্রয়েই তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন। চার দিন ধরে ধানবাদের বিভিন্ন গোপন ডেরায় বারবার অবস্থান বদলে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা চালান এই হোটেল মালিক।

ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ: চাল চালল পুলিশ, ফাঁসলেন মালিক

ঘটনার পর পরই কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বীরেশ্বর মিত্রের সন্ধান পেতে তত্পর হয়ে ওঠে। তিনি যাতে কোনভাবেই দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন বা বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে না পারেন, তার জন্য কৌশলগত চাল চেলেছিল লালবাজার। বীরেশ্বরের মূল দু’টি অ্যাকাউন্ট অবিলম্বে ফ্রিজ বা স্থগিত করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে ডিজিটাল ট্রানজাকশন, এটিএম বা কার্ডের মাধ্যমে টাকা তোলার সমস্ত পথ একলহমায় বন্ধ হয়ে যায়।

সেই কালরাত ও ৯টি তাজা প্রাণের বলি

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে নিউ মার্কেট এলাকার হোটেল ‘শিখা-ইন’-এ আচমকাই বিধ্বংসী আগুন লেগে যায়। অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলের সংকীর্ণ ধোঁয়াচ্ছন্ন গলিপথে আটকে পড়েন আবাসিকরা। পর্যাপ্ত জরুরি নিষ্কাশন পথ (Emergency Exit) এবং উপযুক্ত অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনটি বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে এবং আগুনে ঝলসে প্রাণ হারান মোট ৯ জন।

মর্মান্তিক বিষয়টি হল, নিহত ৯ জনের মধ্যে ৭ জনই ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক, যাঁরা চিকিৎসা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কলকাতায় এসে ওই হোটেলে উঠেছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দুই দেশের প্রশাসনিক মহলেই তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। হোটেলের অগ্নিনির্বাপক ছাড়পত্র ও সুরক্ষা বিধি মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ: সিল একের পর এক বেআইনি হোটেল

এই দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন ও কলকাতা পুরসভা। বেআইনি ও নিরাপত্তাহীন হোটেলগুলির বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে জোরদার অভিযান। শুক্রবার কলকাতা পুরসভা (KMC) এবং পশ্চিমবঙ্গ দমকল বিভাগের একটি যৌথ কমিটি নিউ মার্কেট এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে আইন অমান্য করা ১১টি হোটেল বন্ধ করে সিল করে দেয়।

অভিযানের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ শনিবারেও সেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ জারি থাকে। রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল শনিবার জানান, পুরসভা ও দমকলের যৌথ পরিদর্শনের পর সুরক্ষা বিধি লঙ্ঘনের দায়ে আরও ছ’টি হোটেল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না এবং নিয়ম না মানলে ছাড় পাবে না কেউই।

তদন্তের পরবর্তী ধাপ

বেহালা থেকে গ্রেফতারির পর বীরেশ্বর মিত্রকে লালবাজারের গোয়েন্দা দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুলিশ আধিকারিকরা তাঁকে হেফাজতে নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করছেন। মূল কোন কোন গাফিলতির কারণে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটল, অগ্নিসুরক্ষার বৈধ লাইসেন্স ছিল কি না এবং পালিয়ে যাওয়ার পর ধানবাদে তাঁকে কারা কারা সাহায্য করেছিল—এই সমস্ত বিষয় জেরার মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে বলে মনে করছে পুলিশ।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee