বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

রক্তাক্ত যাদবপুর, রাজপথে মুখোমুখি দুই ছাত্র সংগঠন

20 August, 2026 3:10 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

কলকাতা : যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারদেওয়ালের ভেতরের রক্তক্ষয়ী উত্তাপ এবার আছড়ে পড়ল দক্ষিণ কলকাতার খোলা রাজপথে! বুধবার মধ্যরাতের রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার সকালে রীতিমতো থমথমে হয়ে উঠল পুরো যাদবপুর চত্বর। এবিভিপি (ABVP) এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এসএফআই (SFI) ও ডিএসএফ (DSF)-এর মুখোমুখি মিছিলকে কেন্দ্র করে গড়িয়াহাট থেকে যাদবপুর ৮-বি বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত এলাকা রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, স্লোগান-পাল্টা স্লোগান এবং একে অপরের ওপর তেড়ে যাওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ও সংলগ্ন রাস্তায় মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী।

অশান্তির সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল বুধবার রাতেই। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র সংসদ ‘ফেটসু’ (FETSU)-র একটি গভর্নিং বডির (GB) বৈঠক চলছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ‘অরবিন্দ ভবন’-এ। অভিযোগ, বৈঠক চলাকালীন আচমকাই সেখানে চড়াও হয় ডানপন্থী ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-র কয়েকজন সদস্য। তাদের প্রশ্ন ছিল—যেখানে ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষ এবং প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব নেই, সেখানে কিসের ভিত্তিতে এই জিবি বৈঠক ডাকা হয়েছে?

এই নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হতেই মুহূর্তের মধ্যে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। ফেটসু ও বামপন্থী ছাত্রদের অভিযোগ, এবিভিপি সমর্থকেরা বৈঠকে ভাঙচুর ও হামলা চালিয়েছে। পাল্টা এবিভিপির দাবি, তাদের শান্তিকামী সমর্থকদের ওপর বেধড়ক মারধর করেছে বামপন্থী ছাত্ররা। সংঘর্ষের জেরে বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত হন এবং তাঁদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঘটনার গভীর রাতেই দক্ষিণ কলকাতার স্থানীয় বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে যাদবপুর থানায় একটি লিখিত এফআইআর (FIR) দায়ের করেন বিই (BE) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র অরিত্র সরকার। পুলিশ সূত্রের খবর, সেই অভিযোগে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও এসসি-এসটি (SC/ST) আইনের একাধিক গুরুতর ধারায় ১১ জন নামজাদা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (Pro-VC) সরাসরি পুলিশের সাহায্য চান। এরপরই বিশাল পুলিশ বাহিনী ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করে বহিরাগতদের বের করে দেয়।

বুধবারের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের জেরেই বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। দুই পক্ষই সকাল ১১টা থেকে পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়।

একদিকে, ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস ফেডারেশন (DSF) এবং এসএফআই (SFI)-এর নেতৃত্বাধীন বাম ছাত্র সংগঠনগুলি যাদবপুর ৮-বি বাস স্ট্যান্ড থেকে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বের করে। এই মিছিলে আটকে পড়েন বাম রাজনীতির পরিচিত মুখ তথা যুবনেত্রী দীপ্সিতা ধর এবং এসএফআই-এর রাজ্য সভাপতি দেবাঞ্জন দে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের দিকে তাঁদের মিছিল এগোনোর চেষ্টা করতেই বিশাল পুলিশ বাহিনী ব্যারিকেড গড়ে রাস্তা পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়।

অন্যদিকে, পাল্টা শক্তি প্রদর্শনে নেমে গোলপার্ক থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেট অভিমুখে মিছিল শুরু করে এবিভিপি। তাদের মিছিল ঢাকুরিয়া ব্রিজের কাছে পৌঁছতেই পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। চরম উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়। ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবিভিপির উত্তেজিত সমর্থকরা।

রাস্তায় পুলিশের কড়া নজরদারির মাঝেই কয়েকজন এবিভিপি সমর্থক কৌশল বদলে সোজা পৌঁছে যান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা সংগঠনের পতাকা ওড়াতে শুরু করেন। এই দৃশ্য চোখে পড়তেই ক্যাম্পাসের ভেতর থেকে গর্জে ওঠেন বামপন্থী ছাত্রছাত্রীরা। তাঁরা দ্রুত গেটের সামনে জড়ো হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

এসএফআই নেতাদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, “এবিভিপির এই গুণ্ডামি ও স্বৈরাচারী মনোভাব যাদবপুরের মাটি মেনে নেবে না। থানা পার করে মিছিল যদি ক্যাম্পাসের দিকে ইঞ্চিও এগোয়, তবে তার পরিণতি ভালো হবে না।”

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত এই সংযোগস্থলে বৃহস্পতিবার দিনভর যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে নিত্যযাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, ভেতরে ভেতরে যে ছাইচাপা আগুন জ্বলছে, তা যেকোনো মুহূর্তে আবার বড় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee