‘বিজয়া দশমী’র অর্থ কী? ‘দশমী’ কি সত্যিই মন খারাপের তিথি?

জ্যোতিষাচার্য উৎপলকুমার দাস
পঞ্চমী থেকে বাঙালির দুর্গাপুজোর শুরু। এরপর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমী। চারদিন পরে আমাদের দশমীতে সকলকে কাঁদিয়ে বিদায় নেন দেবী। এই দিনটিকে বিজয়া দশমী বলা হয়। তবে এই দিনটিকে কেন ‘বিজয়া দশমী’ বলা হয়, তার সার্বিক অর্থ নিয়েই এই লেখা।
দশমী কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালির আবেগ আর মন খারাপ মিশ্রিত একটি দিন ও তার অনুভূতি। দশমী এলে বাঙালির মনে ভেসে ওঠে দেবীর ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা। কারণ তাঁর অপেক্ষায় থাকতে হবে আরও একটি বছর। সাধারণত দুর্গাপুজোর শেষ হয় দশমীর মাধ্যমে। এই দিনেই দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ‘দশমী’ কথাটি সাধারণ অর্থ খুবই সহজ। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে ( কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা কার্তিক মাসও হয়ে যায়) পিতৃগৃহ ছেড়ে আবার কৈলাসে পাড়ি দেন মা। সেই কারণেই এই তিথিকে বিজয়া দশমী বলা হয়। তবে দশমীকে ‘বিজয়া’ বলার কারণ খুঁজতে গেলে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি পাওয়া যায়। সর্বাধিক প্রচলিত কাহিনিটি হল, মহিষাসুরের সঙ্গে দীর্ঘ ৯ দিন যুদ্ধ করার পর দশমীর দিনে অসুরের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলেন দেবী। তাই তাকে বিজয়া বলা হয়। এছাড়াও শ্রী শ্রী চণ্ডীর কাহিনি অনুসারে, দেবীর আবির্ভাব হয় আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে। পরের শুক্লা দশমীতে মহিষাসুর বধ করেন তিনি। এই বিজয়া দশমী সেই বিজয়কেই চিহ্নিত করে।

বাংলায় যেমন দশমীকে ‘বিজয়া দশমী’ বলা হয়, তেমনই উত্তর ও মধ্য ভারতে এই দিনটিতে দশেরা উৎসব উদযাপন করা হয়। তবে তার তাৎপর্য সম্পূর্ণ আলাদা। ‘দশেরা’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘দশহর’ থেকে। যার অর্থ দশানন রাবণের মৃত্যু। বাল্মিকী রামায়ণে বলা হয়েছে, আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতেই রাবণকে বধ করেছিলেন রাম। কথিত আছে রাবণ বধের পরে আশ্বিন মাসের ৩০ তম দিনে অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করেছিলেন রাম,সীতা ও লক্ষণ। রাবণ বধ ও রামচন্দ্রের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে যথাক্রমে দশেরা ও দীপাবলি পালন করা হয়ে থাকে। তবে দুর্গা পুজোর শেষ দিন হিসেবে দশমী শোকের ছায়া বহন করলেও শাস্ত্রে এই দিনটিকে সেভাবে দেখা হয়নি। এ প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের একটি কাহিনি উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী রানি রাসমণির জামাতা মথুরবাবু দুর্গা পুজোর শেষ দিন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। দক্ষিণেশ্বরের প্রধান পুরোহিত এবং মা কালীর সেবক স্বয়ং রামকৃষ্ণদেবকে বলেন, তিনি মা দুর্গাকে বিসর্জন দেবেন না। মন্দিরে রেখে দেবেন চিরকালের জন্য। তখন রামকৃষ্ণ তাঁকে বোঝান যে, বিজয়ার অর্থ দেবী ও সন্তানের বিচ্ছেদ নয়। তিনি আরও বলেন, মা কখনও তাঁর সন্তানের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেন না। এতদিন মা ঠাকুর দালানে বসে পুজো নিয়েছেন, এরপর তিনি সন্তানের হৃদয় মন্দিরে অধিষ্ঠান করবেন এবং পুজো নেবেন। এরপর মথুরবাবু শান্ত হন এবং দুর্গা প্রতিমার বিসর্জন দিতে রাজি হন।
মা দুর্গার বিসর্জনের পরই বাংলার প্রচলিত রীতি ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, আশীর্বাদ নেয়। সমবয়সীরা কোলাকুলি করে। সঙ্গে চলে মিষ্টিমুখ। আসলে কথাটা বিজয়া দশমী হলেও এ এক অনন্য সামাজিক মিলন উৎসব। সমস্ত রাগ–অভিমান ভুলে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন। এই দিন সব শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার দিন। শুভ এবং আনন্দঘন পরিবেশে মেতে ওঠার দিন।
