বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

বিজয়ার নারকেল নাড়ু: হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গন্ধ

21 October, 2026 11:07 AM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

মা, ঠাকুরমার তৈরি নারকেল নাড়ুর স্মৃতি টেনে নিয়ে যায় শৈশবে। লিখেছেন সন্দীপন বিশ্বাস

বয়সটা তো ভালোই হল। চুলের কালো রং হারিয়ে গেছে অনেক দিন আগেই। এখন সব চুল যেন শরতের কাশফুল। চোখের দৃষ্টিও আগের মতো নেই। তবু শরতের আকাশে সাদা মেঘ দেখলে, কাশফুলের কথা মনে পড়লে, কিংবা বিজয়ার সকালে বাড়ির কোথাও ধূপের গন্ধ ভেসে এলে, হঠাৎ মনে হয়, আমি বুঝি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটি হয়ে গিয়েছি। পায়ে ধুলো মেখে উঠোনে ছুটে বেড়াচ্ছি। আর ঘরের এক কোণে বসে মা আর ঠাকুমা ব্যস্ত হয়ে নারকেল নাড়ু বানাচ্ছেন।
আমাদের ছোটবেলায় দুর্গাপুজো মানে শুধু নতুন জামা, ঠাকুর দেখা কিংবা পাড়ার প্যান্ডেলে রাত জেগে ঘুরে বেড়ানো ছিল না। পুজোর আনন্দের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকত বাড়ির রান্নাঘর। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর মিষ্টিমুখ। আজকের মতো তখন দোকানে দোকানে এত রকমের মিষ্টির সম্ভার ছিল না। আর থাকলেও বাড়ির তৈরি নাড়ুর সঙ্গে তার কোনও তুলনাই হতো না। বিজয়ার প্রীতি, ভালোবাসা আর আত্মীয়তার বন্ধন যেন ছোট্ট গোল গোল নারকেল নাড়ুর মধ্যেই জমাট বেঁধে থাকত।
পুজো আসতে তখনও বেশ কয়েক দিন বাকি। বাড়িতে শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। নতুন জামাকাপড় কেনা হয়েছে কি না, ঘরদোর পরিষ্কার হল কি না, আত্মীয়স্বজন কে কে আসবেন, বিজয়ার দিন কাদের বাড়িতে যাওয়া হবে—এসবের পাশাপাশি একটা বিশেষ প্রস্তুতি চলত রান্নাঘরে। নারকেল নাড়ু বানানোর প্রস্তুতি।

পুজোর কদিন আগে থেকেই বাড়িতে নারকেল আসত। বেছে বেছে ভালো নারকেল। তারপর মাটির দাওয়ায় বসে শুরু হতো নারকেল কোরা। সেই দৃশ্য আজও চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাই। পিঁড়ি পেতে বসেছেন ঠাকুরমা, মা, জেঠিমা। সামনে নারকেল কোরার বঁটি। পাশে স্তূপ করে রাখা নারকেল। হাতের কাজ চলছে দ্রুত, অথচ কী আশ্চর্য নিপুণতায়! আমরা ছোটরা আশপাশে ঘুরঘুর করছি। কখনও কোরানো নারকেল থেকে আমাদের হাতে দিলে একটু মুখে পুরে নিচ্ছি, কখনও কৌতূহলী চোখে দেখছি, কীভাবে এত সাধারণ একটা জিনিস থেকে এমন অসাধারণ মিষ্টি তৈরি হয়।
মা আমাদের ধমক দিতেন, “যা এখান থেকে, এখনই সব খেয়ে ফেলবি নাকি? নাড়ু হবে কী দিয়ে?”
কিন্তু আমাদের কী আর অত ধৈর্য আছে! ওই কোরানো নারকেলের মধ্যেও যে কী আনন্দ ছিল, তা আজকের ছেলেমেয়েদের বোঝানো কঠিন। তখন তো আমাদের কাছে সব কিছুই ছিল নতুন আবিষ্কারের মতো। একটা নারকেল ভেঙে তার সাদা শাঁস বেরিয়ে আসা, সেই শাঁস কোরানোর পর ছোট ছোট তুষারের মতো জমে ওঠা—এসবও ছিল দেখার মতো ব্যাপার।
তারপর শুরু হত আসল কাজ। কড়াই চাপানো হতো উনুনে। নারকেল আর গুড়ের মেলবন্ধন ঘটত ধীরে ধীরে। কখনও চিনির নাড়ু, কখনও গুড়ের নাড়ু। তবে গুড়ের নাড়ুর স্বাদই ছিল আলাদা। গুড় গলতে শুরু করলেই একটা মিষ্টি গন্ধ সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ত। তার সঙ্গে মিশত নারকেলের নিজস্ব গন্ধ। কড়াইয়ে কাঠের খুন্তি নাড়ার শব্দ, উনুনের আগুনের তাপ, রান্নাঘরের চারপাশে বড়দের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে মনে হতো, পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর জায়গা আর নেই।
কড়াই থেকে পাক নামানোর পর শুরু হতো নাড়ু পাকানোর পালা। হাতে সামান্য ঘি মেখে গোল গোল নাড়ু তৈরি করতেন ঠাকুরমা। তাঁর আঙুলের ফাঁকে নারকেলের মিশ্রণ ঘুরে ঘুরে নিখুঁত গোল আকার নিত। আমরা দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম। কখন একটা নাড়ু হাতে পাব!
মাঝেমধ্যে একটা ছোট্ট নাড়ু আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বলতেন, “নে, এটা খেয়ে দেখ তো বাবু, পাক ঠিক হয়েছে কি না।”
সেই মুহূর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ বলে মনে হতো। গরম গরম নাড়ু হাতে নিয়ে ফুঁ দিতে দিতে খেতাম। মুখের মধ্যে গুড়ের মিষ্টি, নারকেলের নরম দানা আর সেই অনির্বচনীয় গন্ধ মিলেমিশে যেত। মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি এই ছোট্ট গোল মিষ্টিটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। জীবনে আর কিছু না পেলেও চলবে, যদি প্রতিটি পুজোয় এমন নাড়ু খেতে পাই!
আজ এত বছর পরেও বুঝি, সেই আনন্দ আসলে নাড়ুর স্বাদে সীমাবদ্ধ ছিল না। ওই নাড়ুতে মিশে থাকত আমাদের গোটা পরিবার। সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক টুকরো সংসার। সেই সংসারের কোনও সদস্যকে আলাদা করে ভাবা যেত না। প্রত্যেকে ছিলেন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে। নারকেল নাড়ু ছিল সেই বন্ধনেরই মিষ্টি প্রতীক। সেই মুহূর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ বলে মনে হতো।
বিজয়া দশমীর দিন সকাল থেকেই বাড়িতে অন্য রকম ব্যস্ততা। ঠাকুর বিসর্জনের সঙ্গে ছিল প্রণাম, কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ। বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতাম। তাঁরা মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতেন। তারপর সামনে আসত থালা ভর্তি নাড়ু, নিমকি, মোয়া, সন্দেশ। বাড়ির তৈরি নারকেল নাড়ু থাকত সবার আগে। আত্মীয়স্বজন এলে মা বলতেন, “নিজের হাতে বানিয়েছি, একটু মুখে দাও।” সেই কথার মধ্যে কোনও আত্মপ্রচার ছিল না। ছিল আপনজনকে নিজের ঘরের ভালোবাসাটুকু খাইয়ে দেওয়ার তৃপ্তি।
বিজয়া মানেই ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে নতুন করে ছুঁয়ে দেখা। সারা বছর দেখা হয়নি এমন আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া, প্রতিবেশীর সঙ্গে কোলাকুলি, পুরনো অভিমান ভুলে একে অপরকে কাছে টেনে নেওয়া। আর সেই সম্পর্কের সেতুতে মিষ্টির একটা বড় ভূমিকা ছিল। মিষ্টিমুখ করানো নিছক রীতির পালন নয়, যেন বলা—তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা মধুর থাকুক, আগামী দিনগুলো ভালো কাটুক।
নারকেল নাড়ু সেই সংস্কৃতির একেবারে ঘরোয়া, সহজ অথচ গভীর অংশ।
আমরা বন্ধুরা মিলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বড়দের প্রণাম করতাম। জুটত খই, মুড়ি, নারকেলের নাড়ু। বাসুর বাবা কলকাতায় চাকরি করতেন। তাঁকে প্রণাম করলে তিনি আমাদের সবার হাতে পাঁচ পয়সা করে দিতেন। সেই পয়সা দিয়ে আমরা বিসর্জনের ঘাটে আইসক্রিম বা ঘুগনি কিনে খেতাম।
তারপর সময় বদলাল। মাটির দাওয়ার জায়গায় এল পাকা মেঝে। উনুনের জায়গা নিল গ্যাস। সংসারের ব্যস্ততা বাড়ল। আমরাও বড় হয়ে গেলাম। পড়াশোনা, চাকরি, সংসার, সন্তান—জীবন নিজের নিয়মে এগিয়ে গেল। একদিন ঠাকুরমা চলে গেলেন। তারপর মা। তারপর জেঠিমা। একে একে নিভে গেল সেই বাড়ির চেনা আলো।
এখন পুজোর আগে বাজারে গেলে কত রকমের নাড়ু চোখে পড়ে! সুন্দর করে সাজানো, প্যাকেটে মোড়া, নানা দামের। গুড়ের নাড়ু, চিনির নাড়ু, নানা স্বাদের মিষ্টি। চাইলে অনায়াসেই কিনে আনা যায়। কোনও প্রস্তুতির দরকার নেই, নারকেল কোড়ার ঝামেলা নেই, পাকের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা নেই।
তবু দোকানের নাড়ু মুখে তুলতে গেলে কেন জানি না, মন সায় দেয় না। খেতে হয়তো মন্দ নয়। হয়তো উপকরণও ভালো। কিন্তু কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে যায়। স্বাদে নয়, মনে। যে হাত নাড়ু পাকাত, সেই হাত তো আর নেই। যে গলা থেকে ভেসে আসত—“নে, গরম গরম খেয়ে নে”—সেই ডাকও আর শোনা যায় না।
এখন বুঝি, আমরা আসলে নাড়ু খুঁজছি না। আমরা খুঁজছি সেই মানুষগুলোকে, যাঁরা নাড়ু বানিয়ে আমাদের হাতে তুলে দিতেন। খুঁজছি সেই শৈশবকে, যেখানে সামান্য একটি মিষ্টির মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত প্রাপ্তি খুঁজে পেতাম। খুঁজছি সেই নিশ্চিন্ত দিনগুলোকে, যখন মনে হতো, মা আছেন, ঠাকুমা আছেন, বাড়ি আছে—আমাদের হারানোর কিছু নেই।
কিন্তু সময় কাউকে ধরে রাখে না। শুধু স্মৃতিগুলোকে কোথাও জমিয়ে রাখে। আর আশ্চর্যের কথা, সেই স্মৃতির দরজা খুলতে কখনও কোনও বড় ঘটনার প্রয়োজন হয় না। কখনও একটা পুরনো গান, কখনও শিউলি ফুলের গন্ধ, কখনও বিজয়ার সকালে ধূপের ধোঁয়া। আর কখনও শুধুই নারকেল আর গুড়ের মিশ্রিত গন্ধ।
আজও বিজয়া দশমীর সকালে স্নান সেরে বাবা, মা আর ঠাকুরমার ছবির সামনে দাঁড়াই। ধূপ জ্বালি। প্রণাম করি। ছবির মানুষগুলো স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তাঁদের চোখে কোনও অভিমান আছে কি না, আমি জানি না। শুধু মনে হয়, কত কথা বলা বাকি রয়ে গেল! কতবার বলা হয়নি, তোমাদের হাতের নাড়ু খাওয়ার জন্য আজও মন কেমন করে!
প্রণাম করে মাথা তুলি। ঘরে তখন নীরবতা। কোনও কড়াইয়ে নারকেল পাক হচ্ছে না। মাটির দাওয়ায় কেউ বসে নেই। কোথাও কোনও ছোট্ট নাড়ু ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষায় পড়ে নেই।
তবু হঠাৎ নাকে একটা গন্ধ এসে লাগে।
গুড়ের সঙ্গে নারকেলের সেই চেনা গন্ধ। মনে হয়, পাশের ঘরেই বুঝি মা, ঠাকুরমা বসে আছেন। মা ব্যস্ত হয়ে থালা সাজাচ্ছেন। ঠাকুমা আমাকে ডাকছেন—“আয়, নাড়ু খেয়ে যা।”
আমি চোখ বন্ধ করি।
এক মুহূর্তের জন্য বয়সটা যেন আবার কমে যায়। চুলে পাক ধরেনি, দৃষ্টিশক্তি কমেনি। পৃথিবী থেকে একে একে এত মানুষ হারিয়ে যাননি। আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটি। আমার হাতে গরম গরম একটা নারকেল নাড়ু। বাইরে শরতের রোদ। দূরে কোথাও ঢাক বাজছে। মনে হয়, পৃথিবীর সব সুখ এখনও আমার কাছে আছে।
তারপর চোখ খুলি। ছবির মানুষগুলো ছবিতেই থেকে যান। সময় আমাকে ফিরিয়ে আনে বর্তমানের ঘরে। কিন্তু গন্ধটা থেকে যায়। সেই গন্ধের মধ্যেই যেন মা আছেন, ঠাকুমা আছেন, আছে আমার শৈশবের সমস্ত হারিয়ে যাওয়া দিন।
বিজয়ার নাড়ু একদিন ফুরিয়ে যায়। কড়াই ধুয়ে রাখা হয়, উনুন নিভে যায়, বাড়ির মানুষগুলোও একদিন চলে যান। শুধু থেকে যায় গুড় আর নারকেলের সেই অমোঘ গন্ধ। যার সঙ্গে মিশে থাকে শুধু আমার নয় অজস্র শৈশব। তারা প্রত্যেকেই এই বিজয়া দশমীর দিনে ডুবে যায় এক গভীর স্মৃতিমেদুরতায়

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik