বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

ট্রাম্পের মাস্টারস্ট্রোকে ব্যাকফুটে ইরান? হরমুজ প্রণালীতে অধিপত্য হারিয়ে চরম সঙ্কটে তেহরান

19 August, 2026 4:56 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

ওয়াশিংটন : বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম মূল জীবনরেখা হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ইরানের ছক ভেস্তে দিয়ে প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেওয়ার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো একটি মানচিত্র পোস্ট করে ট্রাম্প দাবি করেছেন, সেখানে ইরানের পুঁতে রাখা সমস্ত জলমাইনে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে এবং প্রণালীটি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে কোনও রকমের আলোচনা চলছে না এবং মার্কিন নৌবাহিনীর নৌ-অবরোধ (Naval Blockade) পূর্ণ শক্তিতে বহাল রয়েছে। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী পদক্ষেপে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান অস্ত্র হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে গড়ে তোলা দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে তবে কি ট্রাম্পের চালের সামনে অবশেষে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে ইরান?

হরমুজের ওপর আলগা হচ্ছে তেহরানের মুঠো দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের পর এই প্রথম ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির সত্যতা খুঁজে পাচ্ছেন আন্তর্জাতিক সামরিক ও সামুদ্রিক বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক তথ্য ও সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘মেরিন ট্রাফিক’ (MarineTraffic) এবং ‘কপলার’ (Kpler)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের একক কর্তৃত্ব ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে অন্তত ৯৫টি এবং তার আগের সপ্তাহে ১১৮টি পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করেছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই জাহাজগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশই যাতায়াতের জন্য ওমানের অনুমোদিত রুট ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রসংঘের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই ওমানি রুটের তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল তেহরান। তা সত্ত্বেও মার্কিন নৌবাহিনীর সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি পেয়ে বিভিন্ন দেশের জাহাজ এখন ইরানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই এই নতুন পথ বেছে নিচ্ছে।

টোল আদায় বন্ধ, আর্থিক ধাক্কার মুখে ইরান

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যস্থতাকারী স্মারক চুক্তি (MoU) সম্প্রতি শেষ হওয়ার পর তেহরান আশা করেছিল, বসন্তের মতো আবারও এই প্রণালী দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো থেকে ভারী শুল্ক বা টোল আদায় করতে পারবে। কিন্তু ট্রাম্পের নৌ-অবরোধ এবং বিকল্প ওমানি রুট সচল হওয়ায় সেই সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলো ইরানকে কোনো প্রকার কর দিতে নারাজ। ফলে ওমান উপকূল ঘেঁষে জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরানের কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

‘ডার্ক শিপিং’ এবং ট্রাম্পের পাল্টা কৌশল

সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য বড় বড় তেলবাহী জাহাজ (VLCCs) ব্যবহার করছে। ইরান ও তার অনুগত বাহিনীর হামলা এড়াতে এই জাহাজগুলো নিজেদের ট্র্যাকিং বা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে (‘ডার্ক শিপিং’) পারস্য উপসাগর থেকে বের হয়ে আসছে। বিপজ্জনক এলাকা পেরিয়ে ওমান উপসাগরে পৌঁছানোর পর আন্তর্জাতিক খদ্দেরদের কাছে জ্বালানি তেল হস্তান্তর করা হচ্ছে।

মার্কিন শক্তি সচিব ক্রিস রাইটের মতে, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো, বর্তমানে মার্কিন নজরদারিতে ওমানের পথ ধরে সেই পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইরানের কড়া হুমকি সত্ত্বেও মার্কিন ছত্রছায়ায় বিশ্ব তেল বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অবরোধ, ওমানি রুটের পুনরুজ্জীবন এবং মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর পাহারা—এই ত্রিফলা কৌশলে ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে কোণঠাসা করে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালীর একচ্ছত্র আধিপত্য হারিয়ে এখন কার্যত ব্যাকফুটে তেহরান।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee