ভারত-চিনকে স্বস্তি, শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আপাতত স্থগিত করলেন ট্রাম্প
সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি: ভারত ও চিনের জন্য বড় স্বস্তি। রাশিয়া থেকে তেল কিনলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকর হওয়ার মেয়াদ ছিল ১৮ অক্টোবর। ঠিক একদিন আগে শুল্ক চালু করা স্থগিত করলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মাসে একটি বিলে সই করে আইন করে শুল্ক কার্যকর করার কথা জানায় আমেরিকা।এখনই তা কার্যকর হচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, ‘জাতীয় স্বার্থেই’ এই বিরতি। শুক্রবার গভীর রাতে ট্রাম্প একটি নির্দেশিকা দিয়ে জানান, গ্রাহাম আইনে উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্কের প্রয়োগ তিনি স্থগিত করছেন। এ নিয়ে তিনি কংগ্রেসের কাছে একটি প্রত্যয়নপত্রও জমা দিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে এমন ছাড় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে। তবে এই আদেশে শুধু রাশিয়া-সংক্রান্ত শুল্ক লাগু করা স্থগিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, পরে ইচ্ছে করলে ট্রাম্প সেগুলি চালু করতে পারেন।
‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ নামে একটি বিলে সই করেছিলেন ট্রাম্প। নামকরণ হয়েছে সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে, যিনি ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের অন্যতম কট্টর সমর্থক ছিলেন। কিয়েভ সফর থেকে ফেরার কিছুদিন পরে এ বছর জুলাইয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। আইনে ট্রাম্পকে ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। রুশ অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা, অর্থাৎ চিন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজ়ারবাইজানের সব পণ্যে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর কথা ছিল। পাশাপাশি বহু রুশ সংস্থার উপর নিষেধাজ্ঞা এবং রুশ জ্বালানি পণ্যের মার্কিন আমদানিতে ৫০০ শতাংশ শুল্কের সংস্থান ছিল। সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৮ অক্টোবর। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থের উৎস কমানোই এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল। এই আইনের নিশানায় ছিল রুশ আধিকারিক, ব্যাঙ্ক, জ্বালানি সংস্থা এবং মস্কোর সামরিক অভিযানে সহায়তাকারী বিদেশি সংস্থা। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার সংস্থান ছিল। রুশ তেল-গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর রাস্তাও খুলে দিয়েছিল আইনটি, যার ফলে ভারত ও চিন-সহ ১০টি দেশ ঝুঁকিতে ছিল।
বলপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি রুখতে যথেষ্ট ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য ভারতের উপর এই ১০ শতাংশ শুল্ক আগেই চালু আছে। তার উপরে আরও ১০০ শতাংশ শুল্ক যোগ হত। তবে ভারতীয় রপ্তানিতে ঠিক কতটা প্রভাব পড়ত, তা শুল্কের হার ঘোষণার পরেই বোঝা যেত। গত বছর রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানির জন্য ভারতের উপর ২৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক এবং ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প, যার জেরে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই বাড়তি শুল্ক তুলে নেওয়া হয়, আর ভারত-মার্কিন বাণিজ্য কাঠামোর অংশ হিসেবে পাল্টা শুল্ক কমে দাঁড়ায় ১৮ শতাংশে।
গত মাসে মার্কিন কংগ্রেসে এই বিল পাস হওয়ার পর ভারত স্পষ্ট জানিয়েছিল, নিজের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ করতে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিদেশমন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ চালিয়ে যাবে। মন্ত্রক আরও জানায়, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের তেল বাণিজ্যের প্রসঙ্গ সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর সম্ভাব্য প্রভাব ভারত পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের নরম মনোভাব স্পষ্ট হচ্ছে এবং তিনি প্রকাশ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করছেন। এমনকি ইউক্রেনের নতুন নেতা দরকার, এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, পুতিনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় রুশ ডিজেল আমেরিকায় আসবে। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া তৎক্ষণাৎ ৩ লক্ষ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে, পরবর্তী মাসগুলিতে আরও চালান আসবে। জেলেনস্কি দাবি করেন, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির পরই ইউক্রেনে বেশি হামলা করছে রাশিয়া। অন্য দিকে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ থামাতে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছেন তিনি। জেলেনস্কি ইউক্রেন সরকার চালাতে ব্যর্থ। উপযুক্ত সময় চুক্তি করতে পারে, ইউক্রেনের এমন নেতার প্রয়োজন।
