অভিনয়ের ‘নানা’-রকম
শান্তনু চক্রবর্তী
‘করেছেন বহু রোল, মেধাবী হারামি
প্রেমিক, সাধক সন্ত… চূড়ান্ত নিখুঁত
মগ্ন এক নার্সিসাস। কেন্দ্রে শুধু আমি ।’
—বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দাবানলের মতোই নিজের খামারবাড়িতে প্রায় নিঃশব্দে একা একা হঠাৎ চলে যাওয়ার খবরটা গোটা ভারতের সবরকম মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টা (নাকি কয়েক মিনিট) এর মধ্যেই বাঙালি কবির কলম যখন এমন লাইন উঠে আসে, তখন বোঝা যায় তথাকথিত নায়ক না হয়েও অভিনেতা নানা পাটেকরের ‘স্টার পাওয়ার’ কিছু কম ছিল না। নানার এই তারকাদ্যুতির আঁচ প্রথম পেলাম ১৯৯২ সালে ‘রাজু বন গয়ে জেন্টলম্যান’ দেখতে গিয়ে। ছবির নায়ক যদিও শাহরুখ খান, কিন্তু তিনি তখনও সুপারস্টার শাহরুখ নন। দেখলাম দর্শকের পুরো মনযোগটাই ছবির তথাকথিত ‘সেকেন্ড লিড’ নানা পটেকরের দিকে। তাঁর পর্দা-প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাস, সিটি!প্রতিটি সংলাপের সঙ্গে হাততালি। এই ছবিতে তাঁর চরিত্রটাও এক মাদারি ম্যাজেশিয়নের। শুধু কথা দিয়েই যে ঘটিয়ে দিতে পারে আশ্চর্য ইন্দ্রজাল। নানার বক্স অফিসটাও তৈরি হচ্ছিল ওভাবেই। সংলাপ বলার বিশেষ জাগলারি, জাদুগরিতেই । এই ম্যানারিজমটা ক্রমশ পর্দায় তাঁর চরিত্রায়ণের সঙ্গে সপাটে জুড়ে যাওয়ার আগেই দর্শকের সঙ্গে নানার ভালই মোলাকাত হয়ে গেছে।

এন চন্দ্রার ‘অঙ্কুশ’- এর প্রোটাগনিস্ট চার যুবকের মধ্যে লম্বা, ছিপছিপে, শ্যামলারঙা নানার খাপ খোলা তলোয়ারের মতো ধারালো পর্দা -উপস্থিতিটাই সবচেয়ে বেশি চোখে, মনে লেগে থাকে। নানা দুর্দান্ত অভিনয় করলেও নব্যেন্দু ঘোষের মূলধারার খানিকটা বাইরের ছবি ‘তূষাগ্নি’দর্শক সেভাবে দেখতে পাননি। তবে অনিল কাপুর, জ্যাকি শ্রফদের মতো আটের দশকে উঠে আসা নায়কদের পায়ের তলা থেকে জমিটা কী করে কেড়ে নিতে হয় নানা সেটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন বিধুবিনোদ চোপড়ার ১৯৮৯ সালের ছবি ‘পরিন্দা’-য়। ওই সময়ের বলিউডের চড়া, মোটা ,উচ্চকিত ভিলেনির উল্টোদিকে নানার আন্না শেঠ আবিস্কার করল এক স্থিত-শান্ত- শাণিত-শীতল খলনায়ককে। যে চোখের তারায়, কণ্ঠস্বরে একটুও নিষ্ঠুরতা না এনেও ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে লাশ ফেলে দেওয়ার আদেশ দিতে পারে। আবার আগুন দেখলে কোনও দুর্ঘটনার অতীত স্মৃতির তাড়নায় সেই লোকটাই হিস্টিরিক, পাগলপারা হয়ে যেতে পারে।
শোনা যায় মারাঠি নাটক ‘পুরুষ’-এ নানার অভিনয় মোহিত বিধু ‘পরিন্দা’র জন্য তাঁকে কাস্ট করেছিলেন। নানা নিজেও বলতেন নাটকের মঞ্চই তাঁর আসল ঘর। অরবিন্দ দেশপান্ডে, বিজয় মেহতার মতো মারাঠি নাটকের কিংবদন্তি সব নাট্য নির্দেশকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু অমিতাভ বচ্চনহীন ১৯৯০-এর দশকের বলিউড নানার মধ্যে নতুন এক রাগি যুবককে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় তাঁকে দিয়ে পর্দায় বারবার মঞ্চাভিনয়ের স্টাইলাইজেশন ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে। যেটা শীর্ষ ছোঁয় ‘ক্রান্তিবীর’-এ।

যে ছবির একটি অতি নাটকীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃশ্য আজ সারাদিন সমাজ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ছবির জন্যই নানার সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তি। অথচ ‘খামোশি’তে নানা অভিনীত বোবা মানুষের চরিত্রটি কেন ওই বিশেষ ম্যানারিজমে সংলাপ বলে না, সে জন্য দর্শক ছবিটা প্রত্যাখ্যান করে। বোঝা যায় সত্তরের দশকের ওরিজিন্যাল রাগি যুবকের মতোই নানাকেও ইমেজের খাঁচায় ভরে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। তারমধ্যেও আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখেছি রিচার্ড হ্যাসের বিখ্যাত নাটক রেইন মেকার অবলম্বনে অমল পালেকরের থোড়া সা রোমানি হো যায়ে ছবিতে এক রূপকথার বারিশওয়ালার ভূমিকায় তাঁর আশ্চর্য অভিনয়। কিংবা হলিউডি ‘স্লিপিং উইথ দ্য এনিমি’র ছায়ায় তৈরি ‘অগ্নিসাক্ষী’তে এক স্যাডিস্ট অত্যাচারী স্বামীর চিরত্রে তাঁর হিম নিষ্ঠুরতা।

২১ শতকের পালটে যাওয়া বলিউডের সঙ্গে তাল মিলিয়েই নানা পাটেকরও তাঁর ম্যানারিজমের খোলস ছেড়ে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছিলেন অব তক ছপ্পন , অপহরণ বা রাজনীতির মতো সিনেমায়। কিংবা ওয়েলকার সিরিজের কমেডি হল্লোড়ে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও সেই সময় অনেক বাঁক আসছিল। নানারকমের সামাজিক প্রকল্পে সূত্রে ঋণ পীড়িত, ক্ষরাগ্রস্ত, আত্মহত্যাপ্রবণ মহারাষ্ট্রের কৃষক জীবনের অনেক কাছাকাছি আসার সুযোগ ঘটছিল। হয়ত পরবর্তী কোনও ছবিতে সেই শিকড়ের টানে মাটির কাছে ফিরে যাওয়ার আখ্যানও উঠে আসতে পারত। কিন্তু তার আগেই রাগ ও অভিমানের অনেক হিসেব মুলতবি রেখেই চলে গেলেন বিশ্বনাথ ‘নানা’ পাটেকর।
