বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

দুই কেন্দ্রের উপনির্বাচনে রেকর্ড ভোটের হার, রিগিংয়ের অভিযোগ বিরোধীদের, বড় জয়ের দাবি বিজেপির

06 October, 2026 7:20 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

সংবাদদাতা, কলকাতা: উপনির্বাচনের দিন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ভোটের ছবি ছিল দু’রকম। এক দিকে রেকর্ড ব্যবধানে জয়ের দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অন্য দিকে সকালেই পুলিশের সঙ্গে বচসা ও ধস্তাধস্তির পর গ্রেপ্তার হলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর। বেলা বাড়তেই দুই কেন্দ্রে এজেন্ট তাড়ানো, ছাপ্পা ও ভোট লুটের অভিযোগ তোলেন কংগ্রেস, দুই তৃণমূল, বাম ও আইএসএফ। রেজিনগরে পুনর্নির্বাচনের দাবি ওঠে। সব অভিযোগই খারিজ করেছে বিজেপি। দাবি, ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ। বিকেল ৫টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ভোট পড়েছে ৭৯.৩৯ শতাংশ, রেজিনগরে ৭৮.৪২ শতাংশ। ভোটগণনা ৯ অক্টোবর।

সকাল থেকেই দুই কেন্দ্রে বিক্ষিপ্ত অশান্তির অভিযোগ ওঠে। নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান সস্ত্রীক ২৮০ নম্বর বুথে ভোট দেন। ১৭ বছরের পুরনো মামলায় প্রার্থী হওয়ার পর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি, এখন জামিনে আছেন। বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরতে ঘুরতে সোনাচূড়ায় গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের পোলিং এজেন্টকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। খবর পেয়ে ছুটে আসেন বিজেপির নেতা-কর্মীরা, শুরু হয় কথা কাটাকাটি। তাঁদের দাবি, ওখানে কংগ্রেসের সমর্থকই নেই। এক বিজেপি কর্মী কটাক্ষ করেন, “প্লেয়ারই নেই, খেলবেন কী ভাবে?” মিলন পাল্টা বলেন, প্রথমে প্লেয়ার কারও থাকে না, পরে আসে। বেশ কিছুক্ষণ বচসার পর তিনি ওই এলাকা ছাড়েন।

বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ দিন শুরু করেন রেয়াপাড়ার শিবমন্দিরে পুজো দিয়ে। শান্ত গলায় বলেন, ভোট ভাল হচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করেননি। পুলিশ জানায়, অভিযোগ পেলেই পদক্ষেপ হবে, প্রয়োজনে প্রিভেনটিভ ডিটেনশনও হবে। কংগ্রেসের অভিযোগ, সকালেই তাদের ব্লক সভাপতি আশরাফুল তুল্লাকে অনৈতিক ভাবে আটক করে থানায় নিয়ে গিয়েছে পুলিশ।

রেজিনগরে ভোটের শুরু থেকেই উত্তেজনা। হুমায়ুনের ছেড়ে দেওয়া আসনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী তাঁর ছেলে গোলাম নবি আজাদ। একদম ভোরের দিকে ভোট দিতে যাওয়ার সময় থেকেই পুলিশকে নিশানা করতে শুরু করেন হুমায়ুন। তাঁর দাবি, সকাল থেকে রেজিনগরে তাঁর বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন ছিল। ভোটের লাইনে, ভোট দিয়ে বেরিয়ে এবং পরে দলীয় কার্যালয় থেকেও একই সুরে আক্রমণ চালান তিনি।

বুথের বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর অভিযোগ, প্রত্যেক বুথে অ্যালসেশিয়ান ছেড়ে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, শুভেন্দুর পুলিশ ভোটের নামে মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নেবে কি না। ভোটের আগেই তাঁদের ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করেও পুলিশের “শান্তি” হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। রেজিনগরবাসীকে “মুগুর নিয়ে” রুখে দাঁড়ানোর বার্তা দেন। প্রশ্ন তোলেন, পুলিশ মারতে এলে তিনি কি ছেড়ে দেবেন। রাজ্য পুলিশ ও মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করে আরও বলেন, উপনির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতি দেখে দেশের জরুরি অবস্থার কথা মনে পড়ছে, ভোট করানোর দরকার কী ছিল। এ ছাড়া তাঁর বক্তব্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বলে নোটিফিকেশন করানো হয়েছিল, অথচ উইথড্র ডেটের পরেই সার্টিফিকেট ইস্যু করে দেওয়া যেত।

এর পর রেজিনগরে তাঁর দলীয় কার্যালয়ে পৌঁছে যায় পুলিশ। শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। পুলিশকে উদ্দেশ করে হুমায়ুন বারবার বলতে থাকেন, “দালালি করবেন না।” ধস্তাধস্তিও হয়। শেষে জামা ধরে টানতে টানতে তাঁকে গাড়িতে তোলেন পুলিশকর্মীরা, নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। পরে নির্বাচনী বিধিভঙ্গ, পুলিশকে হুমকি এবং সমর্থকদের প্ররোচিত করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় নওদার বিধায়ককে।

মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার শচীন মক্কর জানান, হুমায়ুন উপনির্বাচনের প্রার্থীও নন, এজেন্টও নন, তাই ভোটের দিন এ ভাবে ঘুরতে পারেন না। আইন ভঙ্গের অভিযোগেই গ্রেপ্তারি। রেজিনগরের বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকারের মন্তব্য, কয়েক দিন আগে হুমায়ুন বলেছিলেন ভোটের দিন ১০টা লাশ পড়বে। তাঁর অভিযোগ, হুমায়ুন দাঙ্গা লাগাতে চান। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, আইন সকলের জন্য সমান, মানতে হবে সকলকেই।

দুপুরে নন্দনায়েকবাড়ের বুথে ভোট দেন শুভেন্দু। সংক্ষিপ্ত সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, নন্দীগ্রামে এখনও পর্যন্ত ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে। উপনির্বাচনে সাধারণত ভোট কম হয়, তবু তিনি ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত আশা করছেন। ২০১৬ সালে প্রায় ৮২ হাজার ভোটে জিতেছিলেন, তাঁর দাবি, বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি সেই ব্যবধান ছাপিয়ে যাবেন। ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জলপাইগুড়িতে বলেন, রেজিনগরে বিজেপি জিতবে, এটা অনেকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁর দাবি, সেখানকার সংখ্যালঘুরাও এ বার বাবরি মসজিদ চান না, উন্নয়ন ও কারখানা চান। নন্দীগ্রামে জয়ের ব্যবধান গত বারের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি হবে বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করেন তিনি।

ভোটগ্রহণ চলে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত। সকাল ৯টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ২০.৮৯ ও রেজিনগরে ১৮.০৫ শতাংশ ভোট পড়ে। সকাল ১১টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ৪৩.৯৫ ও রেজিনগরে ৩৮.৭১ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দুপুর ১টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ভোট পড়েছে ৬০.৩২ শতাংশ এবং রেজিনগরে ৫৬.৪৩ শতাংশ। বিকেল ৫টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ভোট পড়েছে ৭৯.৩৯ শতাংশ, রেজিনগরে ৭৮.৪২ শতাংশ। উপনির্বাচনে এমন হার বেশ ভাল বলেই ধরা হচ্ছে।

বেলা গড়াতেই বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটের নামে প্রহসন হচ্ছে। মিলনের দাবি, কোথাও তাঁদের এজেন্ট নেই, সবাইকে তাড়িয়ে অবাধে ছাপ্পা চলছে। তাঁর অভিযোগ, গোটা বিধানসভায় রিগিং করে ভোট করছে বিজেপি। পরে ভোট লুটের অভিযোগও করেন তিনি। একই অভিযোগ বাম ও আইএসএফের। আইএসএফ চেয়ারম্যান নওশাদ সিদ্দিকী সমাজমাধ্যমে কটাক্ষ করে লেখেন, “নির্বাচনী আপডেট: অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।”

সোনাচূড়ার ভাঙাবেড়ার ২৮৫ ও ২৮৬ নম্বর বুথে কংগ্রেসের পোলিং এজেন্ট বসানো নিয়ে অশান্তির অভিযোগ ওঠে, বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় মিলনকে। কালীচরণপুরের ২৪১ ও ২৪২ নম্বর বুথে অবৈধ জমায়েত সরাতে যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী। স্থানীয় মহিলাদের অভিযোগ, তাঁদের ভোটার স্লিপ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, ভোট দিতেই দেওয়া হয়নি। একই অভিযোগ ওঠে কেন্দামারি গ্রাম পঞ্চায়েতের ২৩৪ নম্বর বুথেও, সেখানে এক তৃণমূল নেতার দোকানঘর ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে। দুপুর থেকে প্রায় একাই এলাকায় হাঁটতে দেখা যায় মিলনকে। ২৮৫ ও ২৮৬ নম্বর বুথ এলাকায় তিনি যেতেই “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি ও “চোর-চোর” স্লোগান ওঠে।

সকালে গ্রেপ্তারির আগে হুমায়ুন যে অভিযোগ করেছিলেন, বেলা গড়াতে সেই সুরেই সরব হয় মমতা তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস ও সিপিএম। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোট দিতে গেলে আঙুলে কালি লাগিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, পুলিশকে জানিয়েও লাভ হয়নি। সিপিএমের অভিযোগ, দাদপুর অঞ্চলের মরাদিঘিতে ১১২, ১১৩, ১১৪ ও ১২২ নম্বর বুথে পুলিশই পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দিচ্ছে না।

মমতা তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী বলেন, প্রত্যেক বুথে এজেন্ট দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ৩১৫টি বুথের মধ্যে এখন ২৫ থেকে ৩০ জন এজেন্ট রয়েছেন, বাকিদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি অবিলম্বে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান। ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল প্রার্থী শফিউজ্জামান শেখেরও একই অভিযোগ। তাঁর দাবি, অনেক বুথে তাঁদের এজেন্টকে বার করে দিয়ে শুধু বিজেপির এজেন্টকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। হুমায়ুনকে নিশানা করে তিনি বলেন, বিধানসভা ভোটে তৃণমূলকে হারাতে হুমায়ুন বিজেপি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন, আজ সেই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েই তাঁর এই পরিণতি।

কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুল্লাহিল কাফি ভোট অবাধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করে নির্বাচন বাতিলের দাবিতে রেজিনগর থানার সামনে ধর্নায় বসেন। জেলাশাসকের দফতরের সামনে ভোট লুটের অভিযোগে বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী।

বিজেপির জবাব

দুই কেন্দ্রেই রিগিং ও বুথ দখলের অভিযোগ নস্যাৎ করেছে বিজেপি। তাদের বক্তব্য, ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হচ্ছে। সোনাচূড়ার প্রসঙ্গে দলের দাবি, ওখানে কংগ্রেসের পোলিং এজেন্টই ছিলেন না।

ফল ৯ অক্টোবর

ভোটগ্রহণ প্রায় শেষের মুখে হুমায়ুন-পুত্র গোলাম নবি আজ়াদ শ্লেষের সুরে বলেন, তাঁর সমস্ত উৎকণ্ঠা কেটে গিয়েছে, রেজিনগরের সকলের মতো তিনিও জেনে গিয়েছেন ফল কী হতে চলেছে। তাই ৯ অক্টোবর ফলঘোষণার দিন গণনাকেন্দ্রে যাবেন না বলেও ঘোষণা করেন তিনি। রেজিনগরে বিজেপির প্রার্থী শাখারভ সরকার, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আছেন মমতা তৃণমূলের রবিউল আলম চৌধুরী, ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের শফিউজ্জামান শেখ, কংগ্রেসের আব্দুল্লাহিল কাফি এবং সিপিএমের সৈয়দ আসাদ আলি।

প্রতিবেদন

UTSAB RC