বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকলেও রক্তের জন্য বাইরে কেন? স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশিকা ঘিরে বিতর্ক

03 October, 2026 7:57 PM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

সুনেত্রা সেনগুপ্ত

বেসরকারি হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও চিকিৎসাধীন রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলে তাঁদের পরিজনেদের রক্ত আনতে পাঠানো হয় অন্যত্র। বিরল গ্রুপের রক্ত হলে, তা-ও কথা ছিল। সাধারণ গ্রুপের ক্ষেত্রেও দেখা যায় অন্য ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকেই রক্ত সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতির বদল ঘটাতেই বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে ‘স্বনির্ভর’ হওয়ার বার্তা দিল রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন রক্ত সঞ্চালন পর্ষদ। এই বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
বেসরকারি হাসপাতালের উদ্যোগে রক্তদান শিবির বা রক্ত সংগ্রহ কম হওয়ার কারণেই চিকিৎসাধীন রোগীদের অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের শরণাপন্ন হতে হয় বলে মনে করছে স্বাস্থ্য দপ্তর। তাই তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের জন্য ওই হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্কেই যাতে সহজে রক্ত পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ‘অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের ওপরে নিয়মিত নির্ভরতা কাম্য নয়। এই বিজ্ঞপ্তিতে যে পাঁচটি দাবি করা হয়েছে তা হল—

প্রথমত, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যাপ্ত রক্ত ও রক্তজাত উপাদান সংক্রান্ত পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা যদি বেশি হয়, তাহলে সেই অনুযায়ী ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্তের মজুত এবং পরিষেবার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিয়ম মেনে নিয়মিত রক্তদান শিবির আয়োজনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, রক্তের চাহিদা পূরণের জন্য শুধুমাত্র অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের উদ্যোগে রক্ত সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, কোনও রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর রক্তের গ্রুপ এবং প্রয়োজনীয় রক্তজাত উপাদান যাতে পাওয়া যায়, সে জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময়মতো রক্তের জোগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
চতুর্থত, অন্য ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে নিয়মিত রক্ত সংগ্রহের প্রবণতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে বিশেষ পরিস্থিতিতে। বিশেষ করে কোনও নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপ বা উপাদানের ঘাটতি থাকলে। কিন্তু নিয়মিতভাবে অন্য জায়গা থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হলে হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্কের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই কারণেই নিজেদের ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চমত, রক্তের যথাযথ ব্যবহার এবং রক্ত মজুত রাখার জন্য হাসপাতালের বিভিন্ন চিকিৎসা বিভাগের সঙ্গে ব্লাড ব্যাঙ্কের সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কোন রোগীর কতটা রক্ত প্রয়োজন, কোন ক্ষেত্রে কোন রক্তজাত উপাদান প্রয়োজন এবং তা কতটা পরিমাণে মজুত রাখা দরকার এই বিষয়ে চিকিৎসা বিভাগ ও ব্লাড ব্যাঙ্কের মধ্যে সমন্বয় থাকলে রক্তের অপচয় কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজনের সময়ে জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বেশি করে রক্তদান শিবির আয়োজনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে নিশ্চিত করতে হবে সেই দান যেন বিনিময়হীন হয়। অর্থাৎ, রক্তদানের বিনিময়ে কোনও উপহার সামগ্রী দেওয়ার প্রথাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি আশ্বস্ত করা হয়েছে , বেসরকারি হাসপাতালগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার জন্য যে কোনও ধরনের সহায়তা করবে রক্ত সঞ্চালন পর্ষদ। অনেকের দাবি, বিজ্ঞপ্তিতে কার্যত মেনেই নেওয়া হয়েছে যে সাধারণ গ্রুপের রক্ত পেতেও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অন্যদিকে, এই বিজ্ঞপ্তির সমালোচনা করেছেন রক্তদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমাজকর্মী অচিন্ত্য লাহা। তাঁর দাবি, এই বিজ্ঞপ্তির জেরে রক্তদান কমবে। প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে কেন রক্ত পাওয়া যাবে না? তিনি বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে রক্ত নিতে হলে বা রক্ত বিনিময় করতে হলে সার্ভিস চার্জ লাগে। তাঁর দাবি, ‘‘শিবিরে কেউ রক্ত দেওয়ার সময়ে দেখেন না সেটা সরকারি না বেসরকারি। যাঁরা রক্ত দেন তাঁরা বা তাঁদের পরিচিত কোনও রোগী যখন চিকিৎসাধীন থেকেও রক্ত পান না, তখন শিবিরে রক্তদানের ক্ষেত্রে উৎসাহ কমে যায়। বিষয়টি বেসরকারিকরণের পথেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।

অন্যদিকে হাটখোলা মেডিক্যাল ব্যাঙ্কের কর্ণধার এবং রক্তদান আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত ডি আশিস বলেন, রক্তের জোগান শুধু ব্লাড ব্যাঙ্কের ওপর নির্ভর করে না। হাসপাতালের বিভিন্ন চিকিৎসা বিভাগে প্রতিদিন কতজন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, কী ধরনের চিকিৎসা চলছে, কতগুলি অস্ত্রোপচার হচ্ছে এবং কোন ধরনের রক্তজাত উপাদানের চাহিদা তৈরি হচ্ছে এই তথ্যগুলির সঙ্গে ব্লাড ব্যাঙ্কের পরিকল্পনার সমন্বয় থাকা জরুরি। তিনি জানান বেসরকারি হাসপাতালে সার্ভিস চার্জ লাগে। তাই যাঁরা রক্তদান করেন তাঁরা যেন রক্তের কার্ডের বিনিময়ে রক্ত পান তা নিশ্চিত করতে হবে। কেউ বেসরকারি হাসপাতালে রক্তদান করে পরে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন। তখন যেন বেসরকারি হাসপতাল থেকেও কার্ডের বিনিময়ে রক্ত পাওয়া যায় তা নিশ্চিত থাকা জরুরি। তিনি বলেন,বেসরকারি হাসপাতালগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে রক্ত সঞ্চালন পর্ষদ। অর্থাৎ কোনও হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক পরিচালনা, রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা পরিষেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এর ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলির ব্লাড ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে রক্তের গুণমান, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তজাত উপাদান সরবরাহের ক্ষেত্রেও উন্নতি আনার চেষ্টা করা যেতে পারে বলে জানান তিনি।

বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে স্বনির্ভর হওয়ার বার্তা দেওয়া হলেও এই নির্দেশ বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। হাসপাতালগুলি নিয়মিত রক্তদান শিবির আয়োজন করছে কিনা, পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহ করছে কিনা, রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত মজুত রাখছে কিনা এবং অপ্রয়োজনে অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের ওপর নির্ভর করছে কিনা, এরকম বিষয়গুলিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। রক্তের জোগান বাড়তে হাসপাতাল, ব্লাড ব্যাঙ্ক, চিকিৎসক, রক্তদাতা এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পরিকাঠামো থাকলেই হবে না, প্রয়োজনের সময়ে সেই পরিকাঠামো কার্যকর করা যাচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সব মিলিয়ে, বেসরকারি হাসপাতালে নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকা সত্ত্বেও রোগীর পরিজনদের অন্যত্র রক্তের জন্য পাঠানোর অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য দপ্তরের এই নির্দেশিকা নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। নিয়মিত রক্তদান শিবির, পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহ, সঠিক সংরক্ষণ এবং হাসপাতালের চিকিৎসা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ককে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই নির্দেশিকার ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে রক্তের জোগান কতটা শক্তিশালী হয় এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের রক্তের প্রয়োজন মেটাতে তাঁদের পরিজনদের অন্যত্র দৌড়ে বেড়ানোর হয়রানি কতটা কমে।

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik