একদিকে জয়, অন্যদিকে আক্ষেপ—আর পাকিস্তানের ‘সুরক্ষা’ ভুলে যাওয়ার লজ্জা
আমস্টেলভিন: একই বিশ্বকাপ। একই মঞ্চ। অথচ তিন দলের গল্প যেন তিন রকম। পুরুষদের হকিতে ওয়েলসকে ৩-১ হারিয়ে ভারত শুরু করেছে আত্মবিশ্বাসের সুরে। মেয়েদের শুরুটা হয়েছে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ চিনের বিরুদ্ধে ২-২ ড্র দিয়ে—দু’বার এগিয়েও জয় অধরা। আর চার বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান? ইংল্যান্ডের কাছে ১-৪ হারের সঙ্গে তাদের নামের পাশে জুড়েছে এমন এক ঘটনা, যা আন্তর্জাতিক হকির সর্বোচ্চ মঞ্চে বিশ্বাস করাই কঠিন।
পুরুষদের শুরুটা কেন আশাব্যঞ্জক?
ওয়েলসের বিরুদ্ধে ভারত ৩-১ জিতলেও স্কোরলাইন ম্যাচের পুরো ছবিটা বলে না। শুরুতে ওয়েলসই কয়েক বার ভারতীয় সার্কেলে ঢুকে চাপ তৈরি করেছিল। গোলরক্ষক সুরজ কারকেরার গুরুত্বপূর্ণ সেভে সেই চাপ সামাল দেয় ভারত। তারপর ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে ভারতের হাতে।
অষ্টম মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে সঞ্জয়ের ড্র্যাগ-ফ্লিক ভারতকে এগিয়ে দেয়। তিন মিনিটের মধ্যেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন অধিনায়ক হরমনপ্রীত সিং। দ্বিতীয়ার্ধেও ভারত চাপ বজায় রাখে। ৪৩ মিনিটে ফের পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করে হরমনপ্রীত নিজের জোড়া পূর্ণ করেন। ওয়েলস ৫৬ মিনিটে স্যাম ওয়েলশের গোলে একটি গোল শোধ করলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আর হাতছাড়া করেনি ভারত।
সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক, ভারতের সেট-পিস। তিন গোলের তিনটিই এসেছে পেনাল্টি কর্নার থেকে। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে এই অস্ত্রটা ধারালো রাখা গেলে বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে হরমনপ্রীতরা।
তবে অধিনায়ক নিজেই সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, তিন পয়েন্ট পাওয়াই প্রথম লক্ষ্য ছিল, কিন্তু শেষদিকে যে ভুল থেকে ওয়েলস গোল পেল, সেগুলি কমাতে হবে।
মেয়েদের ম্যাচে আক্ষেপটা কোথায়?
চিনের বিরুদ্ধে ভারতের ২-২ ড্র-কে শুধু ‘পয়েন্ট খোয়ানো’ বললে ভুল হবে। কারণ প্রতিপক্ষ চিন ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের রুপোজয়ী। ভারতের সামনে ছিল বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই বড় পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় ভারত দু’বার এগিয়েও শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিতে পারেনি।
নাভনীত কৌর ভারতকে এগিয়ে দেন। চিন সমতা ফেরানোর পর দীপিকা আবার ভারতকে সামনে নিয়ে যান। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ছবিটা বদলে যায়। চিন উচ্চপ্রেস বাড়িয়ে দেয়, ভারতীয়দের মাঝমাঠ থেকে বেরোনোর রাস্তা সংকুচিত করে ফেলে। ৩৯ মিনিটে মা নিং পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করে ২-২ করেন। এরপর চাপটা মূলত চিনেরই ছিল।
এখানেই ভারতের জন্য বড় শিক্ষা—লিড নেওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু লিডকে ম্যাচে পরিণত করার পরিণতিটা এখনও পুরোপুরি আসেনি।
তবু এই ড্রকে হতাশার ফল বলা যাবে না। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ, সামনে অলিম্পিকের রুপোজয়ী দল, তার উপর ভারতের ১১ জন খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপে অভিষেক। কোচ সজের্ড মারিনেও এটিকে ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ ড্র’ হিসেবে দেখেছেন।
আর একটা মানসিক বাধাও ভাঙল। চিনের বিরুদ্ধে টানা চার ম্যাচ হারের পর এবার অন্তত হারেনি ভারত।
আর পাকিস্তান? হকির বিশ্বমঞ্চে এমন ভুলও হয়!
ভারত-চিন ম্যাচের লড়াইয়ের পাশে পাকিস্তানের ঘটনা প্রায় অবিশ্বাস্য। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে পেনাল্টি কর্নার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটেক্টিভ গিয়ারই ড্রেসিংরুমে ফেলে এসেছিল পাকিস্তান। ফলে প্রয়োজনের মুহূর্তে মাঠে সেই সরঞ্জাম ছিল না। অধিনায়ক আবু বকর মাহমুদকে গ্রিন কার্ডও দেখতে হয়।
তারপর ম্যাচের ফলও পাকিস্তানের পক্ষে যায়নি। ইংল্যান্ড জিতেছে ৪-১। অর্থাৎ একদিকে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঐতিহ্য, অন্যদিকে বিশ্বকাপের ম্যাচে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জামই সঙ্গে না থাকার মতো মৌলিক ভুল।
পাকিস্তান পুরুষ হকিতে বিশ্বকাপ জিতেছে চার বার—১৯৭১, ১৯৭৮, ১৯৮২ এবং ১৯৯৪। সেই দলই আজ বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে পেনাল্টি কর্নারের গিয়ার আনতে ভুলে গেল—ঘটনার বিদ্রূপটা সেখানেই।
তিনটি ছবিই তাই একই বিশ্বকাপের আলাদা গল্প বলে। ভারতীয় পুরুষদের হাতে জয়ের আত্মবিশ্বাস, মেয়েদের হাতে সম্ভাবনার ইঙ্গিত কিন্তু সঙ্গে লিড ধরে রাখার প্রশ্ন, আর পাকিস্তানের হাতে—এই মুহূর্তে—একটা অবিশ্বাস্য ভুলের লজ্জা।
বিশ্বকাপ সবে শুরু। কিন্তু প্রথম দু’দিনেই ভারত নিজেদের সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। আর পাকিস্তান এমন একটি ঘটনা উপহার দিয়েছে, যা ফলাফলের থেকেও বেশি দিন মনে থাকতে পারে।
