শরৎচন্দ্র: নীরবতার ভিতর যে প্রতিবাদ
সন্দীপন বিশ্বাস
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর গড়পরতা বাঙালির প্রাণের লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেড়শো বছর পূর্ণ করলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের নিয়ে আলোচনা হয় মূলত তাঁদের সাহিত্যকীর্তির কারণে। আর শরৎচন্দ্র এমন একজন, যাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয় বাঙালির নিজের জীবনের কাছে। কারণ শরৎচন্দ্র কেবল গল্প-উপন্যাস লেখেননি, তিনি বাঙালির সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, অভিমান, সামাজিক সংকোচ, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং অপূর্ণতাকে ভাষা দিয়েছিলেন। তাই এই ডিজিটাল সর্বস্ব যুগে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমার মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা টিকে রয়েছে। সুতরাং তাঁর লেখনির মধ্যে একটা রহস্য নিশ্চয় রয়েছে। সেই রহস্য খুঁজতে গেলে হৃদয় দরকার। কেননা তিনি পেনের আঁচড়ে শুধু লিখতেন না, দাগ কাটতেন মানুষের হৃদয়েও।
শরৎচন্দ্রের প্রেমে ফুল আছে, কাঁটাও আছে। সেখানে মিলনের চেয়ে অনেক সময় বিচ্ছেদের অভিঘাত বেশি। তাঁর প্রেমিক-প্রেমিকারা শুধু একে অপরকে ভালোবাসে না, ভালোবাসার জন্য তারা ত্যাগ স্বীকার করে, অপেক্ষা করে, ভুল বোঝে, হারিয়ে যায়। অনেক সময় ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হয়ে ওঠে কাছে না আসা।
প্রশ্ন হল, আজও প্রেমের এই ভাষা বাঙালিকে স্পর্শ করে কেন? কারণ প্রেমের সঙ্গে শরৎচন্দ্র যন্ত্রণাকে বিচ্ছিন্ন করেননি। তাঁর প্রেম কখনও নিছক রোম্যান্টিক আবেগ নয়। তার ভিতরে আছে সামাজিক বিধিনিষেধ, শ্রেণি, জাতপাত, পারিবারিক সম্মান, পুরুষতন্ত্র এবং ব্যক্তিগত দুর্বলতার চাপ। ফলে তাঁর প্রেমের চরিত্ররা যতটা একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে, তার চেয়ে বেশি লড়াই করে নিজেদের সময়ের সঙ্গে। আর সেই লড়াইয়ের শেষ প্রান্তে অনেক সময় থাকে চোখের জল।
আবার প্রশ্ন উঠতে পারে, বাঙালি কি সেই চোখের জল আজও উপভোগ করে? উত্তর হল, সম্ভবত করে। তবে সেই উপভোগের মধ্যে নিছক দুঃখবিলাস নেই। আছে নিজের জীবনের কোনও অপূর্ণতার সঙ্গে চরিত্রগুলির যন্ত্রণা মিলিয়ে নেওয়ার প্রবণতা। শরৎচন্দ্রের চরিত্রের কান্না তাই পাঠকের কান্না হয়ে ওঠে। দেবদাসের অসহায়তা, শ্রীকান্তের ভেসে বেড়ানো, রাজলক্ষ্মীর আকাঙ্ক্ষা, সাবিত্রীর আত্মমর্যাদা, কমললতার স্বাধীন সত্তা কিংবা গৃহদাহের জটিল সম্পর্ক—সবকিছুর মধ্যেই পাঠক নিজের কোনও না কোনও অপ্রকাশিত অনুভূতির প্রতিধ্বনি খুঁজে পান। তাই সেই কষ্ট সর্বজনীন হয়ে আজও বাঙালি পাঠকের বুকের দরজায় গিয়ে আঘাত করে।
কিন্তু শরৎচন্দ্রকে শুধু প্রেমের লেখক বললে তাঁর প্রতি অন্যায় হয়। সমাজকে তিনি যে চোখে দেখেছিলেন, সেই চোখ ছিল তাঁর সময়ের তুলনায় যথেষ্ট আধুনিক। তিনি সমাজের প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতার সামনে বারবার একটি সহজ প্রশ্ন রেখেছেন। নৈতিকতা কার জন্য? সমাজের নিয়ম কে তৈরি করেছে? সেই নিয়মের বোঝা কেন সবসময় দুর্বল মানুষকেই বইতে হবে?
বিশেষত নারীকে তিনি যেভাবে দেখেছেন, বাংলা সাহিত্যে তার গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁর নারী চরিত্ররা নিছক পুরুষের প্রেমের অবলম্বন নয়। তারা আকাঙ্ক্ষা করে, সিদ্ধান্ত নেয়, ভুল করে, প্রতিবাদ করে, আত্মসম্মান রক্ষা করে এবং কখনও কখনও পুরুষের চেয়েও অনেক বেশি নৈতিক শক্তির পরিচয় দেয়। তবু আশ্চর্যের বিষয়, শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে পড়লে অনেক সময় মনে হয়, তিনি যেন চিৎকার করে প্রতিবাদ করছেন না। কোনও অভিযোগ নেই। দাবি নেই। সোচ্চার বক্তব্য নেই। আছে এক নীরবতা। প্রতিবাদী যেন আত্মপীড়নের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতিবাদের ভাষাটুকু রেখে যান। সেটাই হয়ে ওঠে শক্তিশালী এবং মর্মস্পর্শী এক ভাষা! সেই ভাষাই শাশ্বত হয়ে উঠেছে।
একজন বিধবার মুখে তিনি যখন সামাজিক বঞ্চনার কথা বসিয়ে দেন, তখন আলাদা করে সমাজবিরোধী বক্তৃতার প্রয়োজন হয় না। একজন নারীর ভালোবাসাকে যখন সমাজের তৈরি নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করান, তখন পাঠক নিজেই প্রশ্ন করতে বাধ্য হন। একজন নিম্নবর্গের মানুষের জীবনকে যখন মানবিক মর্যাদায় তুলে ধরেন, তখন প্রতিষ্ঠিত শ্রেণিবোধের ভিতটাই নড়ে যায়। শরৎচন্দ্র তাই অনেক সময় সরাসরি সমাজকে আক্রমণ করেননি। তিনি সমাজের আয়নাটিকে তুলে ধরেছেন। আর আয়নার সামনে দাঁড়ালে প্রতিবাদটা পাঠকের ভিতরেই জন্ম নেয়। এই কারণেই তাঁর সাহিত্য আজও পুরনো হয়ে যায়নি।
সময় বদলেছে। সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলেছে। নারীর সামাজিক অবস্থান বদলেছে। প্রেমের প্রকাশ বদলেছে। প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগকে দ্রুতগামী করেছে। অথচ মানুষের ভিতরের একাকিত্ব, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, ভালোবাসাকে হারানোর যন্ত্রণা, সামাজিক স্বীকৃতির সঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব, এসব বদলায়নি।
তাঁর ভাষাও জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ। তিনি জটিলতা তৈরি করে পাঠককে দূরে সরিয়ে দেননি। তাঁর ভাষা সহজ, সাবলীল, কথোপকথনের মতো। কিন্তু সেই সরলতার ভিতরেই তিনি ঢুকিয়ে দিয়েছেন গভীর মনস্তত্ত্ব। ফলে শরৎচন্দ্রকে পড়তে গেলে অভিধান লাগে না, শুধু হৃদয়ের দরজাটা খুলে রাখতে হয়। শরৎচন্দ্র তাই প্রাচীন হলেও তাঁর সাহিত্য সমকালীন।
আর তাঁর নিজের জীবন? সেখানেও যেন তাঁর সাহিত্যেরই একটা ছায়া। তিনি আলোয় থাকার মানুষ ছিলেন না। খ্যাতি তাঁকে অনুসরণ করেছে, কিন্তু তিনি খ্যাতির পিছনে ছোটেননি। তাঁর জীবনযাপন, তাঁর নিভৃতচারিতা, তাঁর ব্যক্তিগত পরিসর, সবকিছুর মধ্যেই একটা আড়াল ছিল। সম্ভবত সেটাও তাঁর স্বভাবের অংশ। একটি অদ্ভুত বৈপরীত্যকে জীবনে তিনি লালন করে গিয়েছেন। তাঁর সাহিত্য জীবনের ভাষা যেন কোথায় গিয়ে একটি স্রোতে মিশে যায়। আমার তাই বারবার মনে হয়, শরৎচন্দ্র কোনও সাহিত্যিকের নাম নয়, তা একটি প্রতিধ্বনির নাম। যে প্রতিধ্বনি তাঁর সাহিত্যের মধ্য দিয়ে আজও অনুরণিত।
