বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

বিভূতিভূষণ: জোনাকির আলোয় যিনি জীবনকে দেখেছিলেন

12 September, 2026 4:18 PM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

সন্দীপন বিশ্বাস

কিছু সাহিত্য শুধু পড়লে হয় না।, তাকে অনুভব করতে হয়। কিছু লেখক কাহিনি নির্মাণ করেন না, তাঁরা আমাদের নিজেরই অন্দরমহলের দরজা খুলে দেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তেমনই একজন মরমী লেখক। তাঁর লেখা পড়তে পড়তে কখন যে বাইরের পৃথিবী থেকে সরে গিয়ে আমরা নিজের ভেতরের কোনও নির্জন অরণ্যে পৌঁছে যাই, তা টেরই পাওয়া যায় না। হঠাৎ আমরা অনুভব করি, এক আলোয় ভরা জগৎকে।

আজ তাঁর জন্মদিন। অথচ বিভূতিভূষণকে মনে পড়লে উৎসবের চেয়ে বেশি মনে পড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। তাঁর সাহিত্যে যে মায়া, তা আনন্দের সঙ্গে এক টুকরো বিষাদকে মিশিয়ে দেয়। অথচ সেই বিষাদে মন ভারাক্রান্ত হয় না। তা যেন অন্য এক ভালোলাগার উদ্ভাস! পথের পাঁচালী, অপরাজিত, আরণ্যক কিংবা তাঁর অসংখ্য ছোটগল্পের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মনে হয়, জীবন আসলে কত অল্পক্ষণের, কত অনিত্য। মানুষ চলে যায়, সেই শূন্যতার মধ্যে পথ এগিয়ে চলে মহাকালের দিকে। সেই পথে সময় এগোয়, প্রজন্ম এগোয়। হরিহর, অপু, কাজল সেই পথ ধরেই এগিয়ে চলে।

বিভূতিভূষণের সাহিত্য পড়লে বুকের ভেতর কেন যেন একটা শূন্যতা জন্ম নেয়। সেই শূন্যতা দুঃখের নয়, আবার নিছক আনন্দেরও নয়। যেন এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের আড়ালে কোথাও এক অসীমের দরজা আধখোলা রয়েছে। চোখের জলের ধারায়, হারিয়ে যাওয়ার বেদনায়, একাকী পথ চলার ক্লান্তিতে সেই অসীমের আনন্দকে খুঁজে পাওয়া যায়।

তাঁর প্রকৃতি তাই নিছক প্রকৃতি নয়। বন তাঁর কাছে শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়, নদী শুধু জল নয়; রাত শুধু অন্ধকার নয়। প্রকৃতির প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আলো-ছায়া যেন মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে কথা বলে। দূরের বাঁশবনের শব্দ, অচেনা পাখির ডাক, সন্ধ্যার আকাশ, শরতের কাশফুল—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, সে তারই এক ক্ষুদ্র অংশ, এক বিস্মিত পথিক।

তিনি অরণ্যের নির্জনতায় ঈশ্বরের মুখ দেখেছিলেন, তাঁর কলমে প্রকৃতি কখনও নিছক পটভূমি হয়ে থাকে না। সে হয়ে ওঠে এক জীবন্ত সত্তা। সেই প্রকৃতি মানুষেরই মতো একা, মানুষেরই মতো ব্যথিত তার অন্তরাত্মা। বিভূতিভূষণ সেই বিরল লেখক, যিনি দারিদ্র্যের ভেতরেও ঐশ্বর্য খুঁজে পেতেন  আবার প্রাচুর্যের মধ্যেও খুঁজে পেতেন এক গোপন শূন্যতা।

আর সেই কারণেই হয়তো বিভূতিভূষণের সাহিত্য এত অন্তর্মুখী। তাঁর চরিত্রেরা যেমন বাইরের পৃথিবীতে হাঁটে, তেমনই হাঁটে নিজেদের ভিতরেও। নিঃসঙ্গতা সেখানে কোনও অভিশাপ নয়; বরং আত্মার ভিতরে জেগে থাকার এক আশ্চর্য অবকাশ।

একটু কল্পনা করা যাক! কোনও এক গভীর রাতে, চারপাশ নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে জমাট বাঁধা অন্ধকার। দূরে কোথাও জোনাকি জ্বলছে, আবার নিভে যাচ্ছে। একের পর এক ক্ষুদ্র আলো অন্ধকারের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে। আর একজন মানুষ চুপ করে তাকিয়ে আছেন সেই দৃশ্যের দিকে। রাত বাড়ছে। ঘুম আসছে না। হয়তো তাঁর মনে প্রশ্ন—এই ক্ষুদ্র আলোর মতোই কি আমাদের জীবন? জ্বলে ওঠা, কিছুক্ষণ পথ দেখানো, তারপর নিভে যাওয়া? তারপর?

তিনি নিজে ছিলেন বড় একা মানুষ। ভিড়ের মধ্যে থেকেও যেন নিজের ভেতরে ফিরে যেতেন বারবার, জোনাকির আলো নেভার মতোই ক্ষণস্থায়ী আনন্দ খুঁজে বেড়াতেন অন্ধকারে। হয়তো সেই একাকীত্বই তাঁকে প্রকৃতির এত কাছে নিয়ে গিয়েছিল। কারণ নির্জনতা ছাড়া কেউ কখনও গাছের শ্বাস শুনতে পারে না, নদীর নীরব কান্না বুঝতে পারে না।

কিন্তু বিভূতিভূষণের মহত্ত্ব এখানেই। তিনি নিভে যাওয়ার মধ্যেও আলো দেখতে পান। জীবন ক্ষণস্থায়ী বলেই তার সৌন্দর্য। মানুষ হারিয়ে যায় বলেই তার স্মৃতি এত গভীর। পথ শেষ হয় বলেই পথ চলার প্রতিটি মুহূর্ত এত মূল্যবান।

বিভূতিভূষণ আমাদের সেই জীবনটাকেই চিনতে শিখিয়েছেন। যে জীবন বড় বড় ঘটনার চেয়ে ছোট ছোট অনুভূতির ভিতরেই সত্যকে প্রকাশ করে। যে জীবনে দারিদ্র্য আছে, মৃত্যু আছে, বিচ্ছেদ আছে; কিন্তু তার পাশেই আছে আকাশ, নদী, বন, জ্যোৎস্না, শিশির, পাখির ডাক এবং অকারণ আনন্দ।

তাই বিভূতিভূষণ পড়লে আমাদের চোখে জল আসে। কিন্তু সেই জল কেবল বিষাদের নয়। তার ভিতর মিশে থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি—যেন সমস্ত হারানোর পরেও কোথাও কিছু হারায়নি।

জীবন যেন এক নির্বেদ ছায়াপথ। আমরা সবাই তার পথিক। কেউ দ্রুত চলে যাই, কেউ একটু ধীরে। পথে কিছু মানুষকে পাই, কিছু মানুষকে হারাই। কিছু স্মৃতি সঙ্গে থাকে, কিছু অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। আর দূরে কোথাও, অদৃশ্য কোনও অসীমের দিকে, আমাদের পথ চলা অব্যাহত থাকে। মনের ভিতর গুনগুন করে একটি চরণ, ‘কী আছে শেষে পথেঈর!’

বিভূতিভূষণ সেই পথের কথাই লিখে গেছেন। জোনাকির ক্ষীণ আলোয়, অরণ্যের নিঃশব্দতায়, নদীর স্রোতে, মানুষের চোখের জলে—তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন অসীমকে।

তাঁর জন্মদিনে তাই তাঁকে শুধু সাহিত্যিক হিসেবে নয়, একজন পথপ্রদর্শক হিসেবেও মনে পড়ে। যিনি আমাদের শিখিয়েছেন—এই ক্ষুদ্র জীবনটাকেও গভীরভাবে অনুভব করতে হয়। কারণ, হয়তো এই ক্ষণিকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অনন্তের সবচেয়ে উজ্জ্বল আভা।

পথের পাঁচালী-তে অপুর চোখ দিয়ে তিনি আমাদের দেখিয়েছিলেন, রেলগাড়ির ধোঁয়া, কাশবনের দোলা, মায়ের মুখের ক্লান্তি, দুর্গার মৃত্যু। এসব যেন সামান্য দৃশ্য নয়, বরং জীবনেরই এক একটি মন্ত্র। তাঁর গদ্যে বিস্ময় আছে, কিন্তু আড়ম্বর নেই। বেদনা আছে, চিৎকার নেই। এই সংযমই তাঁকে অন্য সব লেখকের থেকে আলাদা করে রাখে।

আরণ্যক-এ সত্যচরণের কণ্ঠে যে বিষণ্ণতা শোনা যায়, তা বুঝি বিভূতিভূষণেরই নিজস্ব উপলব্ধি। সভ্যতার অগ্রগতি যে অরণ্যের প্রাণ কেড়ে নেয়, সেই ক্ষতির বেদনা তিনি লিখে গেছেন এক অদ্ভুত মমতায়, কোথাও তীব্র প্রতিবাদ না তুলেও। লবটুলিয়া বইহারের জঙ্গল যেন তাঁর কাছে শুধু ভূমি নয়, এক জীবন্ত সাক্ষী, যার মৃত্যু তিনি নিজের চোখে দেখেছেন।

আর ইছামতী-তে সেই নদীর ধারে বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া কাল যেন থেকে যায় ধরা। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার, তিতুমীরের বিদ্রোহের ছায়া, আর তার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা মানুষের চিরন্তন সুখদুঃখ। এখানেও প্রকৃতি আর ইতিহাস মিলেমিশে একাকার। বিভূতিভূষণের লেখায় এই বৈশিষ্ট্যগুলিই সবচেয়ে বড়।

আজ তাঁর জন্মদিনে মনে হয়, তিনি আসলে আমাদের শিখিয়ে গেছেন একটাই কথা। জীবনের গভীরতম সত্য পাওয়া যায় ক্ষুদ্রের মধ্যেই, বিশালতার মধ্যে নয়। একটি ঝরা পাতা, একটি নক্ষত্রখচিত রাত, একজোড়া ক্লান্ত চোখ—এসবের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অসীমের ইশারা। সেই ইশারার সন্ধান সকলে পান না। যাঁরা পান, তাঁরাই নক্ষত্রের আলোয় জীবনকে দেখতে দেখতে এগিয়ে যান এক আনন্দময় পূর্ণতার দিকে। তিনি তো পথেরই কবি।

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik