বছর শেষেও প্রকৃতির তাণ্ডব, উপকূলে তিনটি ঘূর্ণিঝড়, ভয়ঙ্কর পূর্বাভাস ইসরোর
সংবাদদাতা, কলকাতা: ২০২৬ সালে বছরভর প্রকৃতির তাণ্ডব। এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া পাল্টাচ্ছে। এর উপর ইসরোর সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে আরও উদ্বেগের খবর—বছরের শেষ তিন মাসে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি হতে পারে তিনটি তীব্র ঘূর্ণিঝড়। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর অধীনস্থ স্পেস অ্যাপ্লিকেশনস সেন্টার (এসএসি) জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উত্তর ভারত মহাসাগরে প্রায় তিনটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইসরোর মেটিওরোলজিক্যাল অ্যান্ড ওশানোগ্রাফিক স্যাটেলাইট ডেটা আর্কাইভাল সেন্টার (মোসড্যাক) সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি গ্রাফ প্রকাশ করেছে, যেখানে বর্ষা-পরবর্তী মরসুমে এই তিনটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরোর পূর্বাভাস বলছে, এই ঘূর্ণিঝড়গুলি রীতিমতো শক্তিশালী হবে, যা প্রভাব ফেলবে দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে। গত ৮ সেপ্টেম্বর মোসড্যাকের ওয়েবসাইটে এই পূর্বাভাস প্রকাশিত হয়। হিসেব বলছে, এই পূর্বাভাস সত্যি হলে প্রশাসনের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হবে। এর আগে বঙ্গোপসাগরে ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে হওয়া ৪৪টি ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় প্রায় ৮৩ শতাংশ বেশি শক্তিশালী হতে পারে এই তিনটি ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি। তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই পূর্বাভাসকে কোনও নির্দিষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত নয়। মোসড্যাকের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ভারত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমি প্রবণতা অনুমান করতে দীর্ঘমেয়াদি বায়ুমণ্ডলীয় ও সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গত কয়েক দশকের জলবায়ু ও আবহাওয়া সংক্রান্ত উপাত্ত ব্যবহার করেই ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা এবং শক্তিসূচক (পিডিআই) অনুমানের একটি মডেল তৈরি করেছেন গবেষকরা। ইসরোর এই গবেষণা আগামী দিনে দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতির দিকে বাড়তি নজর রাখা প্রয়োজন। বিশেষত বঙ্গোপসাগরে অক্টোবর-নভেম্বর মাস ঐতিহাসিকভাবেই ঘূর্ণিঝড় তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সেপ্টেম্বরের এই মৌসুমি পূর্বাভাস থেকে কোনও নির্দিষ্ট ঘূর্ণিঝড় ঠিক কোথায় তৈরি হবে, তার গতিপথ কী হবে বা কোন উপকূলে আছড়ে পড়বে—তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
শুধু বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর নয়, আবহবিদদের নজরে রাখতে হবে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরের পরিস্থিতিও। কারণ ওই অঞ্চলে তৈরি হওয়া কিছু ক্রান্তীয় ঝঞ্ঝা বা টাইফুনের অবশিষ্ট অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উপর দিয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে আন্দামান সাগর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। যদিও এর অর্থ এই নয় যে, ওই অঞ্চলে তৈরি হওয়া প্রতিটি টাইফুনই ভারতীয় উপকূলের দিকে ধেয়ে আসবে—কোনও সিস্টেমের চূড়ান্ত গতিপথ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তৎকালীন বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির উপর। তাই ২০২৬ সালের বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের পাশাপাশি আন্দামান সাগর, দক্ষিণ চিন সাগর এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের সামগ্রিক পরিস্থিতির উপরেও নজর রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কেবলমাত্র বাতাসের গতিবেগ দিয়ে কোনও ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি বিচার করা যথেষ্ট নয়। ঝড়ের তীব্রতার পাশাপাশি অতিবৃষ্টিও ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়—অতীতে আমপান বা ইয়াসের ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখা গিয়েছিল। ফলে আগামী তিন মাস ধরে সামগ্রিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মত আবহবিদদের।
