মঞ্চের অন্ধকারে টর্চের আলো...
গৌরব চৌধুরী
ধর্ষক কি শুধু মঞ্চের চরিত্র? নাকি সে লুকিয়ে আছে আমাদের দর্শকসারিতেও?
নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, পুরুষতন্ত্র, ক্ষমতার দম্ভ—এই শব্দগুলো এখন আর খবরের কাগজের পাতাতেই আটকে নেই। প্রতিদিনের সমাজজীবনে এগুলোর নানা চেহারা আমাদের সামনে আসে। সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই মঞ্চে টেনে এনে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে গোবরডাঙা শিল্পায়নের নাটক ‘উত্তম পুরুষ’। নাট্যকার ও নির্দেশক আশিস চট্টোপাধ্যায় এমন একটি নাট্যভাষা তৈরি করেছেন, যেখানে দর্শক শুধু গল্প দেখেন না, শেষ পর্যন্ত নিজেকেও প্রশ্ন করতে বাধ্য হন। এখানেই নাট্যকারের সাফল্য তিনি নাটকের গতি এমন ভাবে বেঁধেছেন যে প্রায় দু ঘণ্টার নাটক নিমেষে শেষ হয়ে যায় তার অসাধারণ ন্যারেটিভ আর অভিনেতা দের অসামান্য অভিনয় কৌশলে ।
‘উত্তম পুরুষ’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি আমার কাছে তার বিষয় নয়, বিষয়টিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। নাটকটি সরাসরি কোনও পুরুষকে ‘খারাপ’ আর কোনও নারীকে ‘ভালো’ বলে দায় মেটায় না। বরং প্রশ্নটা আরও গভীরে নিয়ে যায়—মানুষের মধ্যে ভালো–মন্দ তৈরি হয় কীভাবে? একজন মানুষ কি জন্ম থেকেই অপরাধী, নাকি সমাজ, পরিবেশ, ক্ষমতা, মানসিকতা এবং নিজের সিদ্ধান্ত তাকে সেই জায়গায় নিয়ে যায়?
নাটকের গল্পের কেন্দ্রে অম্বিকা চরিত্রে তানিশা রায়। চরিত্রটির মধ্যে প্রতিবাদ, অসহায়তা এবং লড়াই—তিনটিই একসঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। তানিশার অভিনয়ে অম্বিকা শুধুমাত্র ‘ভিকটিম’ হয়ে ওঠেনি; বরং সে নিজের অধিকারের জন্য দাঁড়ানো একজন মানুষ।এখানেই নির্দেশক গদ বাঁধা ছকের বাইরে বেরিয়ে বুঝিয়ে দিলেন ” নারী পুরুষ” সাম্যের কথা ।
সৌভিক সরকার-এর গুলাব সিং চরিত্রটি নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। চরিত্রটির জটিলতা এবং অন্ধকার দিককে তিনি যেভাবে মঞ্চে বহন করেছেন, তা দর্শকের অস্বস্তি তৈরি করে। আর এই অস্বস্তিই চরিত্রটির সাফল্য। এই নাটকে সৌভিক সরকার এর অভিনয় দেখে বার বার মনে হয়েছে মুম্বাই এর পৃথ্বী থিয়েটারে নওয়াজ কে দেখছি । সেই মানেরই অভিনেতা সৌভিক সরকার । তার সাবলিল হিন্দি তে সংলাপ বলা এবং চরিত্র কে বহন করে নিয়ে চলা , কখনও কখনও নওয়াজ কেও মাত করে দেয় হয়ত ।
প্রিয়েন্দু শেখর দাসের বাবুজি চরিত্রে অভিনয়ে ছিল পরিমিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা। সৌরভ দাস সিদ্ধার্থ চরিত্রে নিজের উপস্থিতি দিয়ে নাটকের বক্তব্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন । স্বপন বণিকের পাণ্ডে এবং তাপস দত্তচৌধুরীর শঙ্কর চরিত্রও নাটকের মূল স্রোতের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে গেছে।সাহেব আলি মণ্ডল গুপ্তাজি চরিত্রে স্বাভাবিক অভিনয়ে নজর কেড়েছেন। মৌসুমী গোস্বামী জয়ার চরিত্রে এবং মৌসুমী চক্রবর্তী মায়ের চরিত্রে নাটকের আবেগের জায়গাগুলিকে শক্ত করেছেন। সৌরভ মণ্ডল প্রেমলতা চরিত্রে এবং তপন দাস সাংবাদিকের ভূমিকায় নাটকের বক্তব্যকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। নন্দদুলাল নন্দীর বিট্টু চরিত্রও নাটকের সামগ্রিক আবহে নিজের জায়গা করে নেয়।
তবে ‘উত্তম পুরুষ’-এর অভিনয় নিয়ে আলাদা করে বলার আগে বলতে হয় আশিস চট্টোপাধ্যায়ের নাট্যভাবনা ও নির্দেশনার কথা। তিনি দর্শককে আরাম করে বসে নাটক দেখার সুযোগ দেননি। দৃশ্যের পর দৃশ্য পেরিয়ে দর্শককে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখানে প্রশ্নটা মঞ্চ থেকে উঠে এসে দর্শকাসনে এসে দাঁড়ায়।
আর সেই কারণেই নাটকের শেষ দৃশ্যটি সবচেয়ে বেশি মনে থেকে যায়।
মঞ্চের অভিনেতারা একে একে হাতে টর্চ তুলে নেন। আলো এবার আর মঞ্চে পড়ে না—আলো যায় দর্শকদের মুখের দিকে। অভিনেতারা দর্শকের মধ্যে খুঁজতে থাকেন—
“কোনও ধর্ষক এখানে লুকিয়ে নেই তো?”
এই মুহূর্তে দর্শক আর দর্শক থাকে না। সে হয়ে যায় প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানো একজন মানুষ।
আমার কাছে এই শেষ দৃশ্যটাই ‘উত্তম পুরুষ’-এর সবচেয়ে বড় বক্তব্য। নাট্যকার যেন বলতে চান—ভালো মানুষ, মন্দ মানুষ—দুটোই মানুষের মস্তিষ্কের ফসল। মন্দকে চিহ্নিত করা যায়, তাকে প্রতিরোধ করা যায়, তাকে ভালো দিকে রূপান্তর করার চেষ্টা করা যায়; কিন্তু মানুষকে মুছে ফেলে সমস্যার সমাধান করা যায় না।
এই জায়গাতেই নাটকটি শুধুমাত্র নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি বক্তব্য হয়ে থাকে না; বরং হয়ে ওঠে মানুষের মস্তিষ্ক, সমাজ এবং নৈতিকতার ওপর একটি প্রশ্নচিহ্ন ।
নাটক শেষ হওয়ার পরও প্রশ্নটি শেষ হয় না। মঞ্চের আলো নিভে যায়, অভিনেতারা মঞ্চ ছেড়ে চলে যান, কিন্তু সেই টর্চের আলো যেন দর্শকের চোখে থেকে যায়। আর তখন মনে হয়—ধর্ষককে খুঁজতে গিয়ে আমরা কি কখনও একবার নিজের ভেতরেও আলো ফেলেছি?
