বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতার শিখতে গিয়ে মৃত্য়ু শিক্ষার্থীর ফারাক্কায় দ্রুত গতিতে চলছে লাইন মেরামতির কাজ মালদা মেডিকেলে শিশুমৃত্য়ুর জের, সাসপেন্ড সুপার অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

Lionel Messi: ‘ক্যাপ্টেন, তোমাকে ছাড়া…’, মেসির বিদায়ে সতীর্থদের বার্তায় কী রইল?

01 September, 2026 2:18 AM Arko Banerjee
শেয়ার করুন

রোজারিও: তিনি কোনোদিন গলা ফাটিয়ে ড্রেসিংরুম গরম করেননি। লম্বা লম্বা বক্তৃতায় মাঠ মাতানো তাঁর ধাতে ছিল না। তাঁর নেতৃত্বটা ছিল এক শান্ত ঝড়ের মতো—চাপের মুখে দলকে বুক দিয়ে আগলানো, সবচেয়ে অন্ধ গলিটায় আলো জ্বালানো, আর দল-হারলে সব দায় নত মস্তকে মাথা পেতে নেওয়া। তারকা-সুলভ ‘অহং’ বা আমিত্ব নয়, মেসি ছিলেন দলের ‘আমাদের’ প্রতিনিধি। পরাজয়ের তীব্র বেদনায় সতীর্থদের সঙ্গে কান্নার সঙ্গী, আবার ট্রফি জয়ের পরম মুহূর্তে তাঁদেরই কাঁধে চেপে উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু। তাই লিওনেল আন্দ্রেস মেসির নীল-সাদা বিদায়ের খবরটা বাতাসে ভাসতেই, ড্রেসিংরুম থেকে সতীর্থদের যে স্বতঃস্ফূর্ত আর্তনাদ ভেসে এলো, তার শব্দ একটাই—‘ক্যাপ্টেন’।

রদ্রিগো দি পলের ছাঁকা কথায় সেই অলিখিত অধিনায়কত্বটাই পরিষ্কার। তিনি দেখেছেন এই মানুষটার ভেতরে দেশের প্রতি ঠিক কতটা নিওন আলো জ্বালানো ভালোবাসা। দেখেছেন কঠিন দিনে হাত না ছাড়া, অন্যায়ের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো, কিংবা একেবারে নতুন ছোকরাটাকে ধরে এনে বুকে জড়িয়ে নেওয়া। ‘মাঠে মেসির দেহরক্ষীর’ শেষ লাইনে যেন আস্ত একটা যুগ থমকে দাঁড়িয়েছে: ‘ইতিহাসের সেরা। তুমি চিরন্তন।’

মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের লাইনগুলো ছোট, কিন্তু সেখানে শব্দের চেয়েও ভারী বুকের ভেতরকার হাহাকার: ‘সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। তুমি সবসময়ই সবার সেরা। আমরা তোমাকে ভালোবাসি, ক্যাপ্টেন।’ যে মানুষটার সঙ্গে বছরের পর বছর ঘাম আর রক্ত ভাগ করেছেন, তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য এর চেয়ে বেশি শব্দের দরকারই বা কী!

আরও পড়ুন: Lionel Messi: যে পায়ে ফুটবল কবিতা হয়েছিল, আজ সেই পায়ে বিদায়ের ভার

ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান ‘কুটি’ রোমেরোর কাছে তো মেসি ছিলেন জোড়া স্বপ্নের মতো। শৈশবে ঘরের দেওয়ালে টাঙানো পোস্টারের নায়ক, আর যৌবনে এসে একই সঙ্গে সতীর্থ আর সেনাপতি! রোমেরোর শ্রদ্ধার্ঘ্যে সেই ফ্যান্টাসি আর বাস্তবের অদ্ভুত এক রক্তমাংসের মেলবন্ধন।

এনজো ফার্নান্দেজের গল্পটা তো একেবারে রুপোলি পর্দার মতো। টিভিতে মেসির খেলা দেখে যে ছেলেটা বয়সের অমিল কষতো—ভাবতো একদিন নীল-সাদা জার্সিতে ওই মানুষটার পাশে দাঁড়ানো যাবে তো? সেই ছেলেটাই ২০২২-এর লুসাইল স্টেডিয়ামে মেসির সঙ্গে ট্রফি উঁচিয়ে ধরলো! আজ সেই স্বপ্নপুরুষ যখন হাত ছেড়ে দিচ্ছেন, এনজোর প্রতিটি শব্দে যেন রূপকথা ভাঙার দীর্ঘশ্বাস।

শুধু এনজো নন—লাওতারো, ম্যাক অ্যালিস্টার, তাগলিয়াফিকো কিংবা লো সেলসোরা তো মেসিকে স্রেফ সতীর্থ হিসেবে দেখেননি, মেসি ছিলেন তাঁদের ফুটবল-জীবনের জ্যান্ত আত্মা। লাওতারো তো কোনো ভণিতা ছাড়াই সোজাসুজি লিখে দিলেন: ‘চিরকাল ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন।’

গোলরক্ষক রুল্লি আবার পর্দাটা সরিয়ে দেখালেন মানুষ মেসিকে। প্রতিটা ঘামের ফোঁটা, নিখাদ বন্ধুত্ব, আর এই দেশের মাটিটার প্রতি নিঃশব্দ প্রেম—মাঠের জাদু ছাড়িয়ে রুল্লির কাছে মেসির ব্যক্তিত্বটাই ছিল আসল ট্রফি।

আর, অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া? বহু ভাঙাচোরা যুদ্ধের পরম সেনাপতি! কাঁটার মুকুট পরা সেই কালো দিনগুলো থেকে একসাথে হাঁটা শুরু, তারপর এক রাতেই সব স্বপ্ন সত্যি করা। দি মারিয়ার কাছেও মেসি একটাই পরিচয়—‘ক্যাপ্টেন’।

এই বার্তাগুলো পর পর সাজালে বোঝা যায়, নেতৃত্ব আসলে কেমন হওয়া উচিত। কোনো হাঁকডাক নেই, আদেশ দেওয়ার ছলচাতুরি নেই। শুধু নিজের কাজটা দিয়ে বাকিদের টেনে নেওয়া।

মেসি তো একবার অদৃষ্টের সঙ্গে অভিমানে দল ছেড়েছিলেন। তারপর যখন ফিরলেন—সেই রূপকথার প্রত্যাবর্তনে কোপা এলো, ফাইনালিসিমা এলো, বিশ্বকাপ এলো, আবার কোপা এলো! কিন্তু সতীর্থদের এই চোখ ভেজা ভালোবাসা স্রেফ রুপোলি ট্রফির জন্য নয়। তাঁরা এমন এক ক্যাপ্টেন পেয়েছিলেন, যিনি ঝড়ের রাতে কোনোদিন জাহাজ ছেড়ে পালাননি।

সামনে আবার কোপা আমেরিকা আসবে, আবার আসবে বিশ্বকাপের নতুন উন্মাদনা। গ্যালারি কাঁপিয়ে আবারও নীল-সাদা জার্সিতে এগারোজন যোদ্ধা সবুজ ঘাসে পা রাখবেন। হয়তো সময়ের টানে কোনো নতুন কাঁধে উঠবে ঐতিহ্যবাহী ওই ১০ নম্বর জার্সির ভার।

সতীর্থদের এই বুটে-বাঁধা আবেগ একটাই জিনিস স্পষ্ট করে দেয়—মেসি নামের এই উত্তরাধিকার কোনো ট্রফির সংখ্যা বা গোলের অঙ্কে মাপা সম্ভব নয়। ফুটবলার মেসির বিকল্প হয়তো এই পৃথিবী একদিন পেয়ে যাবে। কিন্তু তাঁদের সেই প্রিয় ‘ক্যাপ্টেন’ মেসির? ও পথ এখানেই শেষ!

প্রতিবেদন

Arko Banerjee