বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতার শিখতে গিয়ে মৃত্য়ু শিক্ষার্থীর ফারাক্কায় দ্রুত গতিতে চলছে লাইন মেরামতির কাজ মালদা মেডিকেলে শিশুমৃত্য়ুর জের, সাসপেন্ড সুপার এবার রাজ্য়ের মডেল স্কুল প্রকল্পে সিএম শ্রী ইন্সটিউট, ঘোষণা মুখ্য়মন্ত্রীর

বিদায় মেসি: যে মানুষটি একটি দেশের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে হেঁটেছিলেন

31 August, 2026 10:41 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

কিছু বিদায় আসলে বিদায় নয়। সেগুলি একটি যুগের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ…

লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের খবরটিও তেমনই।

আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে আর হয়তো তাঁকে দেখা যাবে না। আর কোনো বিশ্বকাপের রাতে কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষা করবে না তাঁর বাঁ পায়ের জাদুর জন্য। কোনো কঠিন ম্যাচের শেষ মুহূর্তে বল পায়ে নিয়ে মেসি হঠাৎ সময়কে থামিয়ে দেবেন—এই দৃশ্যও হয়তো এবার অতীতের অংশ হয়ে থাকবে।

কিন্তু মেসিকে কি সত্যিই বিদায় জানানো যায়?

যে মানুষটি একসময় আর্জেন্টিনার কাছে ছিলেন অপূর্ণতার অন্য নাম, তিনিই শেষ পর্যন্ত সেই দেশের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের পূর্ণতা হয়ে উঠেছিলেন।

মেসির গল্পটা তাই শুধুই গোল, ট্রফি আর রেকর্ডের গল্প নয়।
এটা অপেক্ষার গল্প।
ব্যর্থতার গল্প।
অভিমান থেকে ফিরে আসার গল্প।
আর শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্য নিজেই বদলে দেওয়ার গল্প।

একসময় মেসিকে বলা হতো—বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি এক নন।

ক্লাবের হয়ে তিনি একের পর এক ট্রফি জিতছেন, রেকর্ড ভাঙছেন, ফুটবলকে নিজের মতো করে লিখছেন। অথচ জাতীয় দলের জার্সি গায়ে বারবার থেমে যাচ্ছেন শেষ দরজার সামনে।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার।

তারপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়।

একসময় হতাশ হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

তখন হয়তো মনে হয়েছিল, পৃথিবীর অন্যতম সেরা ফুটবলারের গল্পটা বুঝি অসম্পূর্ণই থেকে গেল।

কিন্তু কিছু গল্পের শেষ লেখা থাকে না।
তারা অপেক্ষা করে আরও একটি অধ্যায়ের জন্য।

মেসি ফিরে এসেছিলেন।

তারপর ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা।

বছরের পর বছর যে মানুষটির হাতে আর্জেন্টিনার জার্সিতে কোনো বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি উঠছিল না, সেই মেসিই প্রথমবার দেশের হয়ে বড় ট্রফি হাতে তুললেন।

কিন্তু তখনও গল্প শেষ হয়নি।

এসেছিল কাতার।

২০২২ বিশ্বকাপ।

একটি বিশ্বকাপ, যেখানে প্রতিটি ম্যাচে মনে হয়েছিল—এবার হয়তো মেসির শেষ সুযোগ।

তিনি সেই সুযোগকে ইতিহাসে পরিণত করেছিলেন।

ফাইনালের সেই রাত আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। ১২০ মিনিটের নাটক, টাইব্রেকার, আর শেষে মেসির হাতে বিশ্বকাপ।

যে ট্রফিটির জন্য তাঁর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, এত প্রশ্ন, এত সংশয়—শেষ পর্যন্ত সেটিই তাঁর হাতে উঠেছিল।

মেসি তখন শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নন।

তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি অসমাপ্ত গল্পের শেষ পৃষ্ঠা।

এরপর আরও একটি কোপা আমেরিকা।

২০২৪ সালে আবারও চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

একজন ফুটবলারের জন্য হয়তো এর চেয়ে সুন্দর পরিণতি আর হতে পারে না।

তবু জীবন কখনও শুধু ট্রফির হিসাব রাখে না।

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। তাঁর বয়স তখন ৩৯।

আর এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু মাঠের হিসাব ছিল না। ছিল ব্যক্তিগত জীবনের গভীর বেদনা। বাবাকে হারানোর যন্ত্রণা তাঁর সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।

হয়তো এই কারণেই মেসির বিদায়কে শুধু একজন খেলোয়াড়ের অবসর বলা যায় না।

কারণ মানুষটি এতদিন শুধু নিজের হয়ে খেলেননি।

তিনি খেলেছেন একটি দেশের হয়ে।

একটি প্রজন্মের হয়ে।

শৈশব থেকে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা সেইসব মানুষের হয়ে, যারা মেসির পায়ে বল দেখলেই বিশ্বাস করত—অসম্ভব বলে কিছু নেই।

হয়তো আগামী দিনে কোনো ছোট্ট ছেলে ফুটবল খেলতে গিয়ে বাঁ পায়ে বল থামাবে।

কেউ তাকে বলবে, “এভাবে খেলো না।”

সে হয়তো বলবে, “আমি মেসির মতো খেলব।”

সেখানেই মেসি থেকে যাবেন।

রেকর্ডের পাতায় নয় শুধু।

মানুষের স্বপ্নের ভিতরে।

একটা সময় ছিল, মেসিকে প্রশ্ন করা হতো—আপনি আর্জেন্টিনার হয়ে কী জিতেছেন?

আজ সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে মেসির নিজের কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই।

একটি বিশ্বকাপ তাঁর হয়ে কথা বলে।

দুটি কোপা আমেরিকা কথা বলে।

শত শত গোল কথা বলে।

আর সবচেয়ে বেশি কথা বলে সেই মানুষগুলো, যারা মেসির সঙ্গে হেরেছে, কেঁদেছে, আবার তাঁর সঙ্গেই জিতেছে।

ফুটবল আসলে কখনও শুধু ফুটবল ছিল না।

কখনও কখনও একজন মানুষ কোটি মানুষের আবেগের ভাষা হয়ে ওঠেন।

মেসি তেমনই একজন।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—প্রতিভা আপনাকে শুরুতে এগিয়ে দিতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের শেষ লাইনে পৌঁছতে লাগে ব্যর্থতার পরেও ফিরে আসার সাহস।

তাই মেসির বিদায়ে আজ হয়তো আর্জেন্টিনার আকাশ একটু বেশি নীল।

আর একটু বেশি নিঃশব্দ।

কারণ সেই বাঁ পায়ের জাদুকর আর দেশের জার্সিতে মাঠে নামবেন না।

কিন্তু তাঁর গল্প থামবে না।

যতদিন ফুটবল থাকবে, ততদিন কোনো না কোনো স্টেডিয়ামে, কোনো না কোনো ছোট্ট ছেলের পায়ে, কোনো না কোনো স্বপ্নের ভিতরে মেসি আবার জন্ম নেবেন।

বিদায়, লিও।

তুমি হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রাখলে।

কিন্তু পৃথিবীর কোটি মানুষের হৃদয়ে যে নীল-সাদা জার্সি তুমি পরিয়ে দিয়েছ—

সেটি কোনোদিন খুলে রাখা যাবে না।

কারণ কিংবদন্তিরা অবসর নেন।
কিংবদন্তির গল্প কখনও অবসর নেয় না।

মেসির বিদায়ে কাঁদল ফুটবল

মেসির অবসরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যেন গোটা ফুটবল দুনিয়া কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। সতীর্থ থেকে সমর্থক—সকলের প্রতিক্রিয়ায় একই সুর, “এটা শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়।”

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির দীর্ঘদিনের সতীর্থ রদ্রিগো দে পল তাঁকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। তাঁর কথায়, মেসি শুধু দলের অধিনায়ক নন, এমন একজন মানুষ যাঁর উপস্থিতিই সতীর্থদের সাহস জোগাত। মেসির বিদায়ে তাই সতীর্থদের কাছেও তৈরি হয়েছে এক গভীর শূন্যতা।

FIFA-সহ বিশ্বের ফুটবল মহলও মেসির অবদানকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর পথচলা যে ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়, সেই স্বীকৃতি এসেছে নানা প্রান্ত থেকে।

আর্জেন্টিনার ক্লাব রিভার প্লেট, মেসির প্রাক্তন ক্লাব বার্সেলোনা, পিএসজি, সবাই মেসির বিদায়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছে। তার বন্ধু সুয়ারেজ, ডি পল, মেসির সিদ্ধান্তে পোস্ট করেছে।

আর সাধারণ সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া?

সেখানেই হয়তো মেসির আসল পরিচয়।

সামাজিক মাধ্যমে কেউ পুরনো বিশ্বকাপের ছবি পোস্ট করছেন, কেউ ২০২২-এর সেই রাতের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছেন। কেউ লিখছেন, মেসিকে তাঁরা শুধু খেলতে দেখেননি—তাঁর সঙ্গে বড় হয়েছেন।

একজন সমর্থকের অনুভূতি যেন গোটা প্রজন্মের কথা হয়ে উঠেছে—মেসিকে দেখার সময়টা তাঁরা “বেঁচেছেন, ভালোবেসেছেন”।

এমন প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই বোঝা যায়, মেসি আসলে কতটা বড় হয়ে উঠেছিলেন মানুষের জীবনে।

কারও কাছে তিনি ছিলেন শৈশবের নায়ক।
কারও কাছে রাত জেগে বিশ্বকাপ দেখার স্মৃতি।
কারও কাছে বাবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া ফুটবলের প্রথম প্রেম।

তাই আজ মেসি যখন বলছেন, এবার সময় হয়েছে সরে দাঁড়ানোর, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যেন মনে মনে তাঁকে একটা কথাই বলছে—

“তুমি মাঠ ছাড়তে পারো, লিও।
কিন্তু আমাদের স্মৃতি থেকে কখনও নয়।”

প্রতিবেদন

UTSAB RC