বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, নতুন নেপাল তৈরিতে আন্তর্জাতিক সাহায্য চান বলেন্দ্র

29 August, 2026 7:59 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

কাঠমান্ডু : তিব্বত সীমান্ত ঘেঁষে হিমবাহ ধসে সৃষ্টি হওয়া প্রলয়কারী হড়পা বানের তাণ্ডবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে প্রতিবেশী দেশ নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। গত বুধবারের সেই জলপ্রলয়ের পর তিন দিন কেটে গেলেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল রূপ ধারণ করছে। বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ জনের নিথর দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নিখোঁজ অন্তত তিন হাজার মানুষ, যার মধ্যে রয়েছেন তিনশোর বেশি ভারতীয় নাগরিকও। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে দেশজুড়ে যে অভূতপূর্ব কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে নতুন করে নেপালকে গড়ে তুলতে ঠিক কত টাকা বা ‘বিলিয়ন ডলার’ লাগবে, তা নিয়ে প্রবল দুশ্চিন্তায় পড়েছে কাঠমান্ডু।

শনিবার নেপালের বিদেশমন্ত্রী  শিশির খানাল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের বিপর্যয় পরবর্তী পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য কোটি কোটি বা ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের’ বিশাল মূলধনের প্রয়োজন হবে। যা একা নেপাল সরকারের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব।

“বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্যের আর্জি”

শনিবার রাজধানী কাঠমান্ডুতে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে দেশের পুনর্গঠনের বিশাল ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। তিনি জানান, এই মুহূর্তের মূল অগ্রাধিকার হলো আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা এবং মানুষের জীবন বাঁচানো। তবে বন্যার যে নজিরবিহীন ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, তাতে পুরো দেশকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে।

তিনি বলেন, “প্রাথমিক উদ্ধারকাজ মেটার পরেই আমরা জাতীয় স্তরে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাপ করতে একটি বিশেষ গবেষণা ও সমীক্ষা চালাব। তার ভিত্তিতেই তৈরি হবে নেপাল পুনর্গঠনের মাস্টারপ্ল্যান। তবে এক কথা পরিষ্কার—এই পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের খরচ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছাবে। ইতিমধ্যেই যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নেপাল সরকারের নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছে। তাই আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য খোলা আহ্বান জানাচ্ছি।”

টানেলে বন্দি শতাধিক প্রাণ, সেনার সঙ্গে উদ্ধারকাজে হাত মেলাল ভারত

অন্যদিকে, রসুলিয়া জেলার ট্রিশুলি এবং ভটেশিয়া নদীর অববাহিকায় চলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিতে কাজ করা বহু শ্রমিক এখনও মাটির নিচে আটকে রয়েছেন। প্রশাসন সূত্রে খবর, ‘ট্রিশুলি ৩এ হাইড্রো পাওয়ার প্রজেক্ট’-এর দীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রায় ১০০ জনেরও বেশি কর্মী গত তিন দিন ধরে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। পুরো বিষয়টি তদারকি করছে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দফতর।

শনিবার সকাল থেকে টানেলের সামনে থাকা হাজার হাজার টন কাদা, পাথর ও প্লাবণের বর্জ্য সরাতে ড্রিলিং মেশিন ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে উদ্ধারকারী দল। নেপালি সেনাবাহিনীর ৬২ জন এবং আর্মড পুলিশ ফোর্স ও নেপাল পুলিশের ২০ জন সদস্য—মোট ৮২ জনের একটি বিশেষ যৌথ দল সুড়ঙ্গের মুখ উন্মুক্ত করতে নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (NDRRMA) জানিয়েছে, প্লাবিত নদীগুলির তীরে থাকা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত প্রায় ৯৩৩ জন কর্মী বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের একটি বড় অংশই এই সুড়ঙ্গগুলিতে আটকে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে উদ্ধারকাজে গতি আনতে ইতিমধ্যেই নেপালে পৌঁছে গিয়েছে ভারতের বিশেষ উদ্ধারকারী দল। শনিবার সকালে ভারতীয় দলটি দুর্ঘটনাস্থল ট্রিশুলিতে পৌঁছায়। ভারতীয় বায়ুসেনার হেলিকপ্টারে করে তারা চিলমে এবং লাংটাং অঞ্চল জুড়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান বা ‘রেকি’ (Recci) চালিয়েছে। নেপালি বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্গম পাহাড়ি সুড়ঙ্গ থেকে আটকে পড়া মানুষদের বের করে আনতে সমস্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে ভারত।

৩,০০০ নিখোঁজ ও আবহাওয়ার নতুন তাণ্ডবের পূর্বাভাস

সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধারকাজের অগ্রগতি অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এখনও প্রায় তিন হাজার মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৩০০ জন ভারতীয় পুণ্যার্থী ও পর্যটক রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উদ্ধারকারীদের জন্য সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আবহাওয়া দপ্তরের নতুন পূর্বাভাস। নেপালের আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করে জানিয়েছে, প্লাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ফের ভারী বৃষ্টিপাত ও বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় হতে পারে। যদি নতুন করে বৃষ্টি শুরু হয়, তবে পাহাড়ের কাদা ধসে গিয়ে সুড়ঙ্গ পরিষ্কার ও উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

প্রকৃতির এমন বিধ্বংসী তাণ্ডবে নেপালের পাহাড়ি গ্রাম ও নদীর তীরবর্তী শহরগুলি এখন কার্যত শ্মশানক্ষেত্র। প্রাণের সন্ধান চালানোর পাশাপাশি এখন সরকারের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া দেশটিকে ফের নতুন করে দাঁড় করানোর বিলিয়ন ডলারের বাজেট জোগাড় করা।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee