রাস্তা কারো একার নয়...
লোপামুদ্রা ভৌমিক
২৬ আগস্ট। আন্তর্জাতিক সারমেয় দিবস। মানুষের সবচেয়ে কাছের এবং বিশ্বাসী সঙ্গীটির প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং কর্তব্য পালনের অঙ্গীকারে নতুন করে নিজেদের বেঁধে ফেলার দিন। সালটা ২০০৪। আমেরিকার প্রখ্যাত আইনজীবী এবং পশু অধিকার কর্মী কলিন পেইজ স্থানীয় পশু আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আইনগতভাবে দত্তক নিয়েছিলেন কুকুরছানা শেল্টিকে। উদ্দেশ্য ছিল কুকুর দত্তক নিতে মানুষকে উৎসাহিত করা এবং উদ্ধার কেন্দ্রে থাকা কুকুরদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার পাঠ পড়ানো। সেই সঙ্গে অবশ্যই সারমেয়েদের জন্য দায়িত্বশীল মালিকানা নিশ্চিত করা।
কুকুর আর মানুষের সখ্য শুরু সমাজ তৈরির সূচনাকাল থেকে। এক সময়ের হিংস্র, বন্য পশু হিসেবে পরিচিত কুকুর কখন যে মানুষের পায়ে পায়ে ঘুরে তাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিল তার দিনক্ষণ, তারিখ লিখে রাখেনি কেউ। পাহারাদার থেকে ক্রমে মানুষের রোজনামচার অংশ হয়ে আজ সে মানুষের বন্ধু–সহায়ক–কাজের সাথী।
কুকুরের সবচেয়ে বড় গুণ তার বিশ্বস্ততা। মানুষকে ভালোবাসতে বা তার পাশে থাকতে কুকুরের জুড়ি মেলা ভার। আনন্দে বা মন খারাপে—প্রভুকে আগলে রাখে সে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, যে সব সারমেয়ের গায়ে লাগেনি অভিজাত প্রভুর তকমা, তারা আজও চরম অবহেলিত। অনেক সময়ই পথ কুকুরদের আঁচড়ে–কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হন চথচলতি লোকজন। ঘটে গেছে মৃত্যুও। এই ঘটনায় রাশ টানতে পথ কুকুরদের পুনর্বাসনে এখনও সেভাবে কোনও বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়ে ওঠেনি সরকারি তরফে। তবে নড়েচড়ে বসেছে শীর্ষ আদালত। সারা দেশে বেওয়ারিশ কুকুরের সমস্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট নিজে থেকেই একটি মামলা শুরু করে। চলতি বছরের মে মাসে বিচারপতি বিক্রম নাথ, সন্দীপ মেহতা এবং এন ভি আনজারিয়ার বেঞ্চ এক কড়া বার্তায় জানায়, প্রতিটি রাজ্যকে অ্যানিমাল ওয়েলফেয়ার বোর্ড অফ ইন্ডিয়ার নিয়মাবলী ভালোভাবে কার্যকর করতে হবে। প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি সম্পূর্ণ কার্যকরী পশু জন্ম নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। বিচারপতিদের বেঞ্চ জানায়, কুকুরের আক্রমণের ভয় ছাড়া নিরাপদে জীবনযাপন করাটা নাগরিকদের অধিকার। এর আগে ২০২৫–এর নভেম্বরে হাসপাতাল, স্কুল, কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে বেওয়ারিশ কুকুর সরানোর যে নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত তা বহাল রাখা হয়। কিন্তু কীভাবে সরানো হবে পথ কুকুরদের? এজন্য পুরনো বা বাতিল হয়ে যাওয়া পরিবহন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।
এর মধ্যেই গত মে মাসে সর্বোচ্চ আদালত জানায়, কুকুরের কামড়ের ঘটনার জন্য রাজ্যগুলিকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং যারা কুকুরদের খাবারদাবার দেবেন তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে। কুকুরদের ওপর নিয়ম বাস্তবায়নের অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে আদালত। সঙ্গে জনসাধারণের চলাচলের রাস্তায় কুকুরদের খাবার দেওয়া ব্যক্তি এবং সংস্থাগুলির আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। রাস্তাঘাটে বা সর্বসাধারণের ব্যবহারের জায়গায় কুকুর ঘুরে বেড়ানোর ঘটনা ‘উদ্বেগজনক’ বলেও উল্লেখ করা হয়। পশুদের ওপর নিষ্ঠুরতা দমন আইন আনুযায়ী পথকুকুর ‘পাগল’ বা হিংস্র হয়ে গেলে তাকে নিষ্কৃতিমৃত্যু দেওয়া যেতে পারে বলেও জানায় আদালত।
দেশে পথ কুকুরের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। যার মধ্যে অন্যতম, শহরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মনুষ্যেতর প্রাণীদের বিচরণের জায়গা সেই হারে না বাড়ানো, বাড়ির পোষ্যকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে যাওয়া, বন্ধ্যাত্বকরণ ব্যবস্থার প্রয়োগে ঢিলেমি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার পাশে আবর্জনা জড়ো হয়ে থাকা এবং তা পথ কুকুরদের খাবারে পরিণত হওয়া প্রভৃতি।
শীর্ষ আদালতের রায়কে মাথায় রেখে চলতি মাসেই পাগল, রেবিস আক্রান্ত বা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠা পথ কুকুরদের মানবিকভাবে চিরঘুমে পাঠানোর জন্যে ইউথানেশিয়ার নতুন খসড়া নীতি প্রস্তুত করে কেরল সরকারের প্রাণীসম্পদ বিকাশ বিভাগ। নিয়ম অনুযায়ী, কোনও পথকুকুরকে ইউথেনেশিয়া করার সিদ্ধান্ত কোনও পুরসভা বা স্থানীয় আধিকারিক নিতে পারবেন না। প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য একটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি কাজ করবে। এই কমিটিতে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি, পশুচিকিৎসক এবং পশুকল্যাণ সংক্রান্ত প্রতিনিধিরা থাকবেন। কোনও কুকুর সত্যিই জলাতঙ্কে আক্রান্ত কি না, দুরারোগ্য কোনও রোগে অসুস্থ কি না অথবা মানুষের জন্য বিপজ্জনক কি না—প্রমাণ ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পরেই সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কোনও পথকুকুরকে ‘হিংস্র’ বা ‘বিপজ্জনক’ বলে কখন মনে করা হবে? নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যদি কোনও পথকুকুর তাকে উত্যক্ত করা ছাড়াই কোনও মানুষ বা অন্য পশুকে আক্রমণ করে তবেই কুকুরটিকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। আম–জনতার মৌখিক বা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও কুকুরকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। কী ভাবে করা হবে ইউথেনেশিয়া? সোডিয়াম পেন্টোবারবিটাল অথবা থায়োপেন্টাল সোডিয়াম নির্দিষ্ট পরিমাণে শিরার মধ্যে দিয়ে শরীরে চালান করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে মৃত্যুর সময় অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে প্রাণীটি। এভাবেই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং পশুর প্রতি মানবিক আচরণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের কেরালা শাখা। তাদের মতে, রেবিস আক্রান্ত, অসুস্থ এবং বিপজ্জনক কুকুরকে একই প্রোটোকলের আওতায় না এনে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে ভারতে রাস্তার কুকুরের সংখ্যা সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১.৫৩ কোটি। যদিও মার্স পেটকেয়ারের স্টেট অব পেট হোমলেসনেস ইনডেক্স এবং অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার গণনা অনুযায়ী এই সংখ্যাটা প্রায় ৬ কোটি বা তার বেশি। এর মধ্যে ১০ লক্ষ কুকুরের খোঁজ মিলেছে শুধুমাত্র রাজধানী দিল্লিতেই। সুতরাং প্রশ্ন উঠছে, পথ কুকুরদের জন্য নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই তাদের নির্মূল করার ভাবনা কি অমানবিক নয়? এ দায় আমাদের সকলের। মানুষের নিজের জীবন ও নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করতে পথে নামতে হবে নিজেদেরই। কারণ, রাস্তা কারো একার নয়...।
