মহানায়ক আজও কেন পেলেন না দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার !
অনন্ত নাগ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁকে অভিনন্দন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সিনেমায় তাঁর কাজ, বিশেষত কন্নড় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান, নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রের ঘোষণাতেও তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্র যাত্রা ও ভারতীয় সিনেমায় অবদানের কথাই বলা হয়েছে। বাঙালি দর্শক তাঁকে চেনে সেই ১৯৭৪ সাল থেকে। শ্যাম বেনেগালের ‘অঙ্কুর’ ছবিতে তাঁকে আমরা প্রথম দেখি।
কিন্তু এই ঘোষণার আনন্দের পাশেই বাংলা সিনেমার দর্শকের মনে একটি প্রশ্ন আবারও ফিরে এসেছে। প্রতিবছর এভাবেই বাঙালির মনে একটা বিষাদ জমে। সেটা হল দাদাসাহেব ফালকের তালিকায় এখনও মহানায়ক উত্তমকুমারের নাম উঠল না কেন? এটা কি পুরস্কারের অপমান নয়?
প্রশ্নটি অনন্ত নাগকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের নির্বাচনের ইতিহাস নিয়ে। প্রশ্নটি সেই রাষ্ট্রের কাছে, যে রাষ্ট্র ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ১৯৬৯ সালে এই পুরস্কার চালু করেছিল। দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ভারতীয় সিনেমায় সর্বোচ্চ সম্মানগুলির একটি। সরকারি সংজ্ঞায় এই পুরস্কার দেওয়া হয় ভারতীয় সিনেমার বৃদ্ধি ও বিকাশে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে।
সেই তালিকায় দেবিকা রানি থেকে সত্যজিৎ রায়, রাজ কাপুর থেকে দিলীপ কুমার, শিবাজি গণেশন থেকে অশোককুমার, মান্না দে থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে। প্রতিবারই যোগ্য ব্যক্তিকেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কেউ অভিনেতা, কেউ পরিচালক, কেউ সংগীতজ্ঞ, কেউ প্রযোজক। অর্থাৎ পুরস্কারটির পরিধি কখনও শুধুমাত্র ‘অভিনেতা’ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। তবু সেই তালিকায় নেই একজন মানুষ। তাঁর নাম বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস থেকে আলাদা করা কার্যত অসম্ভব। সকলের কাছেই পরিষ্কার যে নামটি উত্তমকুমার।
এখানেই বাঙালির অস্বস্তি। উত্তমকুমার শুধু জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, গায়ক এবং সংগীতচর্চার সঙ্গেও যুক্ত এক বহুমুখী শিল্পী। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তরের সরকারি পরিচিতিতেও তাঁকে বাংলা সিনেমার সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাঁর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্তির উল্লেখ রয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সরকারি ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৬৮ সালে উত্তমকুমার সেরা অভিনেতার ‘ভরত’ পুরস্কার পান। ‘চিড়িয়াখানা’ এবং ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। অর্থাৎ জাতীয় স্তরে অভিনয় প্রতিভার স্বীকৃতির ইতিহাসের একেবারে প্রথম অধ্যায়েই তাঁর নাম রয়েছে।
তাহলে দাদাসাহেব ফালকে তালিকায় তিনি নেই কেন? এর উত্তর আমাদের জানা নেই। আমরা শুধু বলতে পারি, বিবেচনা যথার্থ হয়নি। উত্তমকুমার ১৯৮০ সালে চলে গিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর ৪৬ বছর কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একের পর এক কিংবদন্তি দাদাসাহেব ফালকে সম্মান পেয়েছেন। তাঁদের অনেকেই জীবিত অবস্থায়, আবার কয়েকজন মৃত্যুর পরেও স্বীকৃতি পেয়েছেন। যেমন পৃথ্বীরাজ কাপুর, বিনোদ খান্না প্রমুখ পেয়েছেন মৃত্যুর পর। অতএব ‘মৃত্যুর পর দেওয়া হয় না’—এই যুক্তিও দাঁড়ায় না।
আর পুরস্কারটি যদি সত্যিই ‘ভারতীয় সিনেমার সামগ্রিক অবদানের’ স্বীকৃতি হয়, তাহলে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে। ভারতীয় সিনেমা মানে কি শুধুই হিন্দি সিনেমা? তা অবশ্যই নয়। হিন্দির ক্ষেত্রে পুরস্কারের সংখ্যা বেশি হলেও ভারতের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রের মহারথীরা এই পুরস্কার পেয়েছেন।
ভারতীয় সিনেমা বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির, বহু আঞ্চলিক চলচ্চিত্র-ঐতিহ্যের সম্মিলিত ইতিহাস। বাংলা সিনেমা সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, এঁরা বাংলায় ছবি করে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে একাধিক দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছেন। সরকারি দাদাসাহেব ফালকে তালিকাতেও সেই স্বীকৃতির প্রমাণ আছে। তাহলে সেই বাংলার সর্বাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র-অভিনেতাদের একজনের নাম এখনও কেন অনুপস্থিত? বাঙালির এই প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়।
উত্তমকুমারের গুরুত্ব শুধু তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা বা জনপ্রিয়তায় মাপা যায় না। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল একটি যুগের দর্শক-মনকে বদলে দেওয়া। তাঁর জন্মশতবর্ষে প্রমাণিত হয়েছে, বাংলা ছবির অভিনেতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তায় আজও তাঁর ধারেকাছে কেউ নেই।
উত্তমকুমারের কেন এত জনপ্রিয়? তিনি পর্দায় এলে দর্শক একটি নির্দিষ্ট নায়ককে দেখতেন না, দেখতেন নিজের সময়ের এক স্বপ্নকে। প্রেম, মধ্যবিত্ত জীবন, নাগরিক দ্বন্দ্ব, আত্মসম্মান, ব্যর্থতা, সাফল্য। সবকিছুর সঙ্গে তাঁর পর্দার ব্যক্তিত্বের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে সুচিত্রা সেনের জুটি বাংলা সিনেমায় যে সাংস্কৃতিক অভিঘাত তৈরি করেছিল, তা শুধুমাত্র বক্স অফিসের হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁদের বহু ছবি আজও বাংলা জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। ভারতীয় সিনেমার সরকারি আর্কাইভেও এই জুটিকে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘চিরকালীন জুটি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তা সত্ত্বেও তিনি অবহেলিত। সত্যি কথা বলতে কী, জীবিত অবস্থাতে তাঁর কোনও লবি ছিল না। কাউকে তেল মারার দৃষ্টান্ত নেই। শুধু পরিশ্রম দিয়ে তিনি এই উচ্চতায় উঠেছেন। সেই উচ্চতা স্পর্শ করার ক্ষমতা কেউ দেখাতে পারেননি। তবুও তিনি অবহেলিত। এখনও কি তিনি লবিবাজির শিকার? বাঙালির প্রশ্ন, মহানায়ককে ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মানের তালিকায় দেখতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? এই পুরস্কার না পেলেও তাঁর জনপ্রিয়তা এককণাও কমবে না। উত্তমকুমারের মতো শিল্পীর জনপ্রিয়তা কোনও পুরস্কারই বাড়াতে পারে না। মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও এই জনপ্রিয়তা কমবে না। তখনও হয়তো বহু ছবি নষ্ট হয়ে যাবে। অনেকেই দেখতে পাবেন না তাঁর অভিনয়। কিন্তু থেকে যাবে নামটি। ‘মহানায়ক উত্তমকুমার’।
