সূর্যের তেজ থেকে বিশ্বকর্মা দেবতাদের কোন কোন অস্ত্র তৈরি করেছিলেন?
পুলকেশ সেনগুপ্ত
সূর্য যেন এক অগ্নিগোলক। তাঁর দীপ্তি এতটাইীভা প্রবল যে, তাঁর স্ত্রী সংজ্ঞার পক্ষেও সেই তেজ সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছিল। কে ছিলেন সংজ্ঞা? তিনি ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার কন্যা।
পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, সূর্যের অসহনীয় তেজ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সংজ্ঞা পিতৃগৃহে ফিরে যান। পরে তিনি তপস্যার জন্য অরণ্যে চলে যান এবং নিজের ছায়াকে তাঁর পরিবর্তে সূর্যের কাছে রেখে যান। সেই ছায়াই ‘ছায়া’ নামে পরিচিত। সূর্য প্রথমে বুঝতেই পারেননি যে তাঁর সামনে থাকা স্ত্রী আসলে সংজ্ঞা নন। এই সম্পর্ক থেকেই জন্ম নেয় আরও একাধিক চরিত্র। যাদের মধ্যে শনৈশ্চর বা শনি এবং তপতী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ পায়। সূর্য জানতে পারেন, সংজ্ঞা তাঁর অতিরিক্ত তেজ সহ্য করতে না পেরে দূরে চলে গিয়েছেন। তখন সূর্যকে নিয়ে যাওয়া হয় বিশ্বকর্মার কাছে। বিশ্বকর্মা শুধু দেবতাদের স্থপতি নন, পুরাণের কল্পনায় তিনি এমন এক দেবশিল্পী, যিনি আলো, ধাতু, স্থাপত্য ও অস্ত্র নির্মাণের অতিমানবীয় কারিগরি জ্ঞানের অধিকারী। আর এবার তিনি পেলেন একটা কাজের দায়িত্ব। সূর্যের তেজ কমানো।
বিষ্ণুপুরাণের বর্ণনায়, বিশ্বকর্মা সূর্যকে এক ধরনের যন্ত্রে স্থাপন করে তাঁর অতিরিক্ত দীপ্তি কমিয়ে দেন। পুরাণ মতে সূর্যের তেজের আট ভাগের এক ভাগ মাত্র কমানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এখানেই কাহিনির সবচেয়ে আশ্চর্য অংশ। ছেঁটে ফেলা সেই অতিরিক্ত সৌর-তেজ কিন্তু নষ্ট হয়ে গেল না। পুরাণের ভাষায়, তার জ্বলন্ত অংশ পৃথিবীতে পতিত হল। আর বিশ্বকর্মা সেই তেজ দিয়েই তৈরি করলেন দেবতাদের বহু বিখ্যাত অস্ত্র।
কোন কোন অস্ত্র তৈরি হল?
বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিবের ত্রিশূল, কার্তিকের বর্শা এবং অন্যান্য দেবতার অস্ত্র। বিষ্ণুপুরাণের বর্ণনায় কুবেরের সঙ্গে যুক্ত এক ঐশ্বরিক যান বা উপকরণের কথাও এসেছে। অর্থাৎ পুরাণের কল্পনায় ধ্বংসের অস্ত্রও তৈরি হচ্ছে সৃষ্টির শক্তি থেকেই। সূর্যের অতিরিক্ত তেজ, যা একদিকে সংজ্ঞার কাছে ছিল অসহনীয়, সেটাই বিশ্বকর্মার হাতে পৌঁছে অন্য রূপ নিল। সেই একই শক্তি পরিণত হল দেবতাদের অস্ত্রে।
এখানে বিশ্বকর্মার চরিত্রটিও অন্যভাবে ধরা পড়ে। তিনি শুধু ‘নির্মাতা’ নন। তিনি প্রকৃতির বিপুল শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে মানুষের অথবা দেবতাদের ব্যবহারযোগ্য করে তোলার প্রতীক। আজকের ভাষায় বললে, সূর্যের বিপুল শক্তিকে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। তাকে রূপান্তরিত করতে হয়। পুরাণ সেই ধারণাটিকেই নিজের প্রতীকী ভাষায় বলেছে, অতিরিক্ত সৌরশক্তিকে ছেঁটে নিয়ে বিশ্বকর্মা তাকে পরিণত করেছিলেন কার্যকর শক্তিতে। তবে এটিকে আধুনিক বিজ্ঞানের কোনও বৈজ্ঞানিক বিবরণ হিসেবে পড়া ঠিক হবে না। এটি পুরাণের প্রতীকী কাহিনি। আর পুরাণের সৌন্দর্য এখানেই। প্রকৃতির শক্তি, মানুষের কল্পনা এবং দেবতাদের চরিত্রকে এক সূত্রে বেঁধে একটি কাহিনি তৈরি করা।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সুদর্শন চক্রের উৎপত্তি নিয়ে পুরাণসাহিত্যে অনেকগুলি মত রয়েছে। একটি পুরাণকথায় বিশ্বকর্মার ছেঁটে নেওয়া সূর্যতেজ থেকে সুদর্শন তৈরির কথা বলা হয়েছে। অন্য কাহিনিতে সুদর্শনের উৎপত্তির সঙ্গে অন্য ঘটনাকে যুক্ত করা হয়েছে।
তাই বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে এই কাহিনির আসল আকর্ষণ শুধু দেবাস্ত্রের জন্মে নয়। একজন পিতা তাঁর কন্যার অসহায়তার কথা শুনলেন। একজন দেবশিল্পী সূর্যের অসহনীয় তেজকে নিয়ন্ত্রণ করলেন। আর সেই নিয়ন্ত্রিত শক্তিই হয়ে উঠল দেবতাদের অস্ত্র।
পুরাণের সেই ভাষায়, সূর্যের তেজ কমেনি, তার রূপ বদলেছিল। আর সেই রূপান্তরের কারিগর ছিলেন বিশ্বকর্মা।
আজকের বিজ্ঞানের কথা বলাটাও এ প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আজ আমরা সৌরশক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করেছি। পুরাণ আমাদের বিজ্ঞানকে নীরবে এভাবেই সম্ভবত অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গিয়েছে।
