বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

চতুর্থী থেকেই পুজোর বাতাসে লেগেছে নস্টালজিয়া আর ভালোবাসার গন্ধ

14 October, 2026 5:09 PM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

লিখেছেন দীপ্যমান দত্ত

আজ চতুর্থী। উৎসবের হাওয়া লেগেছে চরাচর জুড়ে। মন তো আর এখন মন নেই, যেন কাশের বন। উৎসবের হাওয়ায় সে দুলে দুলে উঠছে। ভোরের স্বপ্নে ঝরে পড়ছে শিশির ভেজা পুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা কোথাও হয়ে গিয়েছে। কোথায় শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে। শহরের রাস্তায় আলো জ্বলে উঠেছে, প্যান্ডেলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ আর ছুটির দিনের নানা পরিকল্পনা মিলিয়ে বাতাসে এখন পুজো পুজো, এবং ভালোবাসার গন্ধ। সেই গন্ধ আর আনন্দ ইতিমধ্যেই ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।

এই মুহূর্তটা পরিকল্পনার মুহূর্ত। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে প্যান্ডেল হপিংয়ের রুট ঠিক করছে। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ি থেকে দক্ষিণ কলকাতার থিমের মণ্ডপ— কোন পথে গেলে বেশি ঠাকুর দেখা যাবে, কোথায় রাতের আলোয় ছবি সবচেয়ে ভালো উঠবে, সেই নিয়ে চলছে আলোচনা। কেউ আবার ভিড় এড়িয়ে ভোররাতে বেরোনোর পরিকল্পনা করছে। মোবাইলের নোটবুকে তৈরি হচ্ছে মণ্ডপের তালিকা, পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চলছে যাতায়াতের সময় ঠিক করা। পুজোর আনন্দ এখন অনেকটাই পরিকল্পনার মধ্যেও বেঁচে থাকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার তাগিদ অনুভব করছে কেউ কেউ। চেনাশোনার বাইরে যে পরিচয়ের জগৎ সোশ্যাল মিডিয়া তৈরি করেছে, সেখানেও চলছে দেখা করার পরিকল্পনা। কোথাও জমে আছে সুপ্ত প্রেম, কোথাও বন্ধুত্বের আবেগ। সাড়া মিলবে কী! সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকেই এখনও পাননি।

অন্যদিকে, কেউ হয়তো ব্যাগ গোছাচ্ছেন। কাল কিংবা পরশু বেরিয়ে পড়বেন। পাহাড়, সমুদ্র কিংবা দূরের কোনও অচেনা শহরের দিকে। ট্রেনের টিকিট, হোটেল বুকিং, নতুন পোশাক, ওষুধপত্র— সব কিছু একবার মিলিয়ে নেওয়া চাই। পুজোর ছুটিতে বাঙালির ভ্রমণপ্রবণতা যেন আরও এক উৎসব। কেউ দেবী দর্শনের আনন্দে শহরের অলিগলি ঘুরবেন, কেউ আবার শহরের কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির কাছে কয়েকটা দিন কাটাবেন। পুজো তাই একই সঙ্গে ঘরে ফেরার উৎসব, আবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ারও উৎসব।

তবে পুজোর আসল প্রস্তুতি শুধু রাস্তায় কিংবা ভ্রমণের ব্যাগে আটকে নেই। বাড়ির হেঁশেলেও চলছে মহাযজ্ঞের আয়োজন। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত কোন দিন কী রান্না হবে, কে কোন পদ ভালোবাসেন, বাড়িতে অতিথি এলে কী খাওয়ানো হবে— তার হিসেব কষছেন বাড়ির গৃহিণী থেকে শুরু করে পরিবারের অন্য সদস্যরাও। কারও বাড়িতে হবে লুচি-আলুর দম, কোথাও কষা মাংস, পোলাও, চাটনি আর পায়েস। আবার অনেক বাড়িতে পুজোর দিনগুলিতে নিরামিষ রান্নার বিশেষ আয়োজন থাকে। রান্নার তালিকায় শুধু খাবারের পদ থাকে না, থাকে স্মৃতিও। মায়ের হাতের পায়েস, ঠাকুমার বানানো নারকেল নাড়ু কিংবা বহু বছর ধরে চলে আসা কোনও বিশেষ পদ— এই সবের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বাঙালির পারিবারিক পুজোর নিজস্ব ইতিহাস। থাকে নস্টালজিয়া। তাই এই সময়ে একবার পিছন ফিরে দেখাটাও উৎসবের অনুষঙ্গ।

এরই মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা শুরু হয়েছে। দূরের শহরে থাকা ছেলে-মেয়ে বাড়ি ফিরছে, মামাবাড়ি কিংবা পিসির বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। অতিথিদের জন্য বিছানা পাতা, ঘর গুছিয়ে রাখা, আলমারি থেকে নতুন চাদর বের করা— ছোট ছোট কাজের মধ্যেই বাড়ি যেন উৎসবের সাজে সেজে উঠছে। যে বাড়িতে সারা বছর একসঙ্গে বসার সময় মেলে না, সেই বাড়িতেই পুজোর ক’টা দিন সবাইকে ঘিরে বসার অপেক্ষা। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, ভাইবোনেরা একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাবে, রাত জেগে আড্ডা চলবে— এই প্রত্যাশাই পুজোকে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান না রেখে বাঙালির সামাজিক জীবনের এক বড় মিলনমেলায় পরিণত করে।

এই উৎসবের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাণকথাও। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত ‘দেবীমাহাত্ম্য’ বা ‘চণ্ডী’ পাঠে দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূতা দেবী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হন। এই কাহিনি শুধু একটি পৌরাণিক যুদ্ধের বিবরণ নয়; শক্তি, সাহস এবং অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও এর ব্যাখ্যা করা হয়।

কিন্তু বাংলার দুর্গাপুজোর আবেগে আরও একটি কাহিনি গভীরভাবে মিশে আছে। এখানে দুর্গা শুধু মহিষাসুরমর্দিনী নন, তিনি উমা— কৈলাসের ঘর ছেড়ে শরৎকালে সন্তানদের সঙ্গে বাপের বাড়িতে আসা মেয়ে। এই লোকপ্রচলিত কাহিনিতে দেবীর আগমন তাই শুধু দেবীর আরাধনা নয়, ঘরে মেয়ের ফিরে আসা।

এই উমার আগমনের সঙ্গে বাঙালির নিজের জীবনও যেন মিলে যায়। যে মেয়ে বিয়ের পরে দূরে থাকে, সে পুজোয় বাপের বাড়ি ফিরবে। যে ছেলে কাজের সূত্রে অন্য শহরে থাকে, সেও ছুটি নিয়ে বাড়ি আসবে। যে আত্মীয়ের সঙ্গে সারা বছর দেখা হয় না, তার সঙ্গে জমবে গল্প। পুরাণের দেবীর ঘরে ফেরা আর বাস্তবের মানুষের ঘরে ফেরার মধ্যে তৈরি হয় এক আশ্চর্য সেতু। বাঙালির ঘরে ঘরে মায়ের আর্তি বেজে ওঠে সেই মেনকার সুরেই— ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী’। কিংবা ‘এবার আমার উমা এলে আর উমারে পাঠাব না’।

চতুর্থীর এই সময়টায় তাই অপেক্ষারও একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। পুজো এখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি, অথচ আনন্দের অনেকটাই প্রাপ্তির কাছাকাছি এসে গিয়েছে। নতুন পোশাকের অপেক্ষা, প্রথম ঠাকুর দেখার উত্তেজনা, বাড়ির রান্নার গন্ধ, আত্মীয়ের সঙ্গে পুনর্মিলন— সব মিলিয়ে বাঙালির উৎসব যেন ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে। তাই অপেক্ষার আনন্দকেও বাঙালি এই সময় তার জীবনের সবটুকু দিয়ে গ্রহণ করে।

আসলে দুর্গাপুজো কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট তিথির অনুষ্ঠান নয়। এটি স্মৃতির, সম্পর্কের, মিলনের এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উৎসব। মণ্ডপে দেবীর চোখ আঁকা হলে যেমন প্রতিমা প্রাণ পায় বলে বিশ্বাস, তেমনই মানুষের মনে প্রিয়জনের উপস্থিতি আর একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দে পুজো পূর্ণ হয়ে ওঠে। দুর্গাপুজো মানে সম্বৎসেরর বিপন্নতা ভুলে নতুন করে বাঁচার কয়েকটি দিন।

প্রতিবেদন

Sandipan Saha