বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

সনিয়ার আত্মজীবনী প্রকাশ ঘিরে সংঘাত তুঙ্গে! চাপ দেওয়ার অভিযোগে কংগ্রেস, পাল্টা ‘মিথ্যাচারের’ তোপ বিজেপির

29 August, 2026 5:17 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

নয়াদিল্লি: প্রাক্তন কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধীর বহু প্রতীক্ষিত আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অফ লাভ’ প্রকাশকে কেন্দ্র করে এবার জাতীয় রাজনীতিতে তৈরি হলো তীব্র বিতর্ক। ভারতীয় বাজারে বইটি প্রকাশ না করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ‘পেনগুইন র‍্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া’-র সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পরেই মুখোমুখি সংঘাতের রাস্তায় হেঁটেছে কংগ্রেস এবং শাসকদল বিজেপি। নরেন্দ্র মোদী সরকারের ‘চাপের’ মুখেই প্রকাশনা সংস্থা সনিয়ার বই পিছিয়ে দিতে বা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী শিবির। অন্যদিকে কংগ্রেসের এই দাবিকে ‘মনগড়া গল্প’ এবং নিজের ভুল ঢাকতে ‘ভণ্ডামি’ বলে পাল্টা জবাব দিয়েছে পদ্ম শিবির।

বিতর্কের সূচনা শুক্রবার, যখন ‘পেনগুইন র‍্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া’ এক বিবৃতি জারি করে জানায় যে, তারা ভারতে এই আত্মজীবনীর প্রকাশক থাকছে না। অথচ এর কিছুদিন আগেই আমেরিকার ‘অ্যালফ্রেড এ কফ’ (পেনগুইন র‍্যান্ডম হাউসের একটি অংশ) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল যে আগামী ১০ নভেম্বর সনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হতে চলেছে। পেনগুইন ইন্ডিয়ার দাবি, তারা বইটি প্রকাশে আগ্রহী ছিল, কিন্তু লেখকের দেওয়া তথ্যের সততা যাচাই ও সম্পাদনা (ফ্যাক্ট-চেকিং) করা তাদের মূল দায়িত্ব। সূত্রের খবর, প্রকাশনা সংস্থার পক্ষ থেকে বইয়ের বেশ কিছু অংশে পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা সোনিয়া গান্ধী সরাসরি নাকচ করে দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসে তারা।

প্রকাশনা সংস্থার এই পদক্ষেপের পরেই সরব হন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা। লোকসভায় কংগ্রেসের উপনেতা গৌরব গগৈ সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ পেনগুইন ইন্ডিয়ার বিবৃতিকে ‘দুর্বল’ আখ্যা দিয়ে লেখেন, “পেনগুইন ইন্ডিয়া ‘এক্সাম ওয়ারিয়রস’ বা আরএসএস-কে নিয়ে একাধিক বই প্রকাশ করতে দারুণ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কিন্তু বিজেপি সরকারের অনেকেই নিশ্চিতভাবে ভারতবাসীর হাতে এই বইটি যাওয়ার খবরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।”

একই সুরে সুর মিলিয়েছেন রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলট। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যখন বিশ্বজুড়ে পেনগুইন সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী হুবহু প্রকাশ করতে রাজি, তখন ভারতে তা প্রকাশে এত বাধা কিসের? কেন্দ্রীয় সরকারের কোন অদৃশ্য চাপে বা কীসের ভয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রকাশিত হওয়া একটা বই ভারতে বেরোতে পারছে না? সোনিয়া গান্ধীর মতো একজন সর্বভারতীয় ব্যক্তিত্ব এবং প্রাক্তন বিরোধী নেত্রীর বই এভাবে আটকে দেওয়া মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।”

কংগ্রেসের এই সুর চড়ানোকে বিন্দুমাত্র রেয়াত করেনি বিজেপি। বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সি আর কেশবন কংগ্রেসকে ‘ভণ্ড’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনীর ঠিক কোন কোন তথ্যগুলো যাচাই করা প্রয়োজন ছিল এবং কেন প্রামাণিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল, মূল বিষয়টি সেটাই। কংগ্রেস এখন ভয় পাওয়ার একটা কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।” অপর এক বিজেপি নেতা অজয় অলক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে নতিস্বীকার করার কোনো প্রশ্ন নেই। বরং লজ্জার বিষয় হলো, একটা বই লেখার সময়েও আপনারা সঠিক তথ্য সামনে রাখছেন না। সততা ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতেই প্রকাশনা সংস্থা এই পদক্ষেপ করেছে।”

কী রয়েছে সোনিয়ার বইতে? যা নিয়ে এত বিতর্ক

কংগ্রেস সূত্রের খবর, আত্মজীবনীতে প্রধানত তিনটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সোনিয়া গান্ধীর লেখনী এবং প্রকাশনা সংস্থার অমিলই এই সংঘাতের মূল কারণ:

১. চিন সীমান্ত বিতর্ক: বইটিতে ভারত-চীন সীমান্ত সমস্যা, বিশেষ করে লাদাখসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশ এবং বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু বিস্ফোরক দাবি রয়েছে।

২. প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাজের ধরণ: কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রধান নীতি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব দেওয়ার শৈলী নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন তুলেছেন সোনিয়া।

 ৩. আরএসএস-এর প্রভাব: বিজেপির বৈचारिक অভিভাবক জাতীয় সংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) সম্পর্কে সোনিয়ার নিজের মূল্যায়ন। ভারতের সামাজিক কাঠামো ও দেশের রাজনীতিতে আরএসএস-এর প্রভাব নিয়ে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিকোণ বইটিতে স্পষ্ট।

সূত্রের খবর, পেনগুইন ইন্ডিয়া যখন এই তিনটি বিষয়ের বেশ কিছু অংশ বাদ বা সংশোধন করার প্রস্তাব দেয়, তখন তা বিনাবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন সোনিয়া গান্ধী। তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল, বইয়ে উল্লিখিত সমস্ত তথ্য ও বক্তব্য তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ফসল, তাই এখানে কোনো ধরনের সম্পাদনা বা পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।

সব মিলিয়ে, বই প্রকাশের আগেই সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনীকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে যে পারদ চড়তে শুরু করেছে, তা বইটির আন্তর্জাতিক আত্মপ্রকাশের দিন যত এগিয়ে আসবে, তত আরও উত্তপ্ত হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee