‘নতুনদের সুযোগ দেওয়া উচিত!’ গডকড়ির এক মন্তব্যেই তুমুল জল্পনা, অস্বস্তিতে মোদি সরকার ?
নয়াদিল্লি : ‘‘পরবর্তী প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়া উচিত। গত ৩০ বছর ধরে একটানা কাজ করে চলেছি, এখন আর অত কাজ করা সম্ভব নয়। নতুনদের হাতে কাজ সঁপে দিয়ে বয়স্কদের কেবল অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা উচিত।’’
নাগপুরের এক অনুষ্ঠানে ৬৯ বছর বয়সী কেন্দ্রীয় সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রী নিতিন গডকড়ির করা ঠিক এই কয়েকটি মন্তব্যই এখন জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে তুমুল তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। মোদি মন্ত্রিসভার অন্যতম প্রবীণ ও প্রভাবশালী মন্ত্রীর মুখে হঠাৎ এই ‘অবসর’ ও ‘নেতৃত্ব বদলের’ সুর শুনে রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা— তবে কি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন গডকড়ি ? নাকি তাঁর এই বক্তব্যে আদতে মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়ল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকারের ওপরেই ?
যদিও জল্পনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তেই ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছে গডকড়ির কার্যালয়। মঙ্গলবার তাঁর দপ্তর থেকে স্পষ্ট বিবৃতি জারি করে জানানো হয়, নাগপুরের অনুষ্ঠানটি ছিল মূলত জনজাতি এলাকায় শিক্ষাপ্রসারী সংস্থা ‘লক্ষণরাও মানকর ট্রাস্ট’-এর। গডকড়ি ট্রাস্টের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং তরুণদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গেই কথাগুলি বলেছিলেন। এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় রাজনীতি বা মন্ত্রিসভার কোনো সম্পর্ক নেই। সংবাদমাধ্যমের একাংশ তাঁর বক্তব্যকে মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাজনৈতিক রং চড়াচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের মতে, গডকড়ির এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও জল অত সহজে থিতু হওয়ার নয়। বিশেষ করে যখন রাজধানীতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়ে জোর জল্পনা চলছে এবং বিজেপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক স্তরে রদবদল ঘটিয়ে স্মৃতি ইরানিকে সাধারণ সম্পাদক ও রাম মাধবকে সহ-সভাপতি করা হয়েছে, ঠিক সেই সময়ে গডকড়ির এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কেন বাড়ছে মোদি সরকারের ওপর চাপ?
-
প্রবীণ বনাম নবীন বিতর্ক: বিগত দিনে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, পাবলিক পরীক্ষার দুর্নীতির প্রতিবাদে ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’-র নেতৃত্বে দিল্লিজুড়ে তরুণ সমাজের যে ব্যাপক ক্ষোভ ও ‘জেন জি’ (Gen Z) আন্দোলন দেখা গেছে, তাতে রীতিমতো কোণঠাসা শাসক শিবির। দল যখন তরুণ ভোটারদের টানতে তড়িঘড়ি নিজেদের ভাবমূর্তি বদলাতে চাইছে, তখন দলের প্রবীণতম মন্ত্রীর মুখ থেকে “নতুনদের জায়গা ছেড়ে দেওয়া”র বার্তা স্বাভাবিকভাবেই শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর এক পরোক্ষ নৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
-
ইথানল-পেট্রোল বিতর্ক ও ব্যাকফুটে মন্ত্রী: কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ইথানল-মিশ্রিত পেট্রোল সংক্রান্ত নীতির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন এই নাগপুরের সাংসদ নিতিন গডকড়ি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও জ্বালানির মান নিয়ে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে পরিবেশকর্মীদের তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। বিরোধী দলগুলিও এই ইথানল বিতর্ককে হাতিয়ার করে গডকড়ি তথা পুরো সরকারের ওপর আক্রমণ শানিয়েছে।
-
আইনি লড়াই ও বিভ্রান্তি: ইথানল-পেট্রোল বিতর্ক এতটাই জটিল রূপ নেয় যে গডকড়ির নাম জড়িয়ে একাধিক এআই-জেনারেটেড ‘ডিপফেক’ (AI Deepfake) ও বিকৃত ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। জুলাই মাসে বম্বে হাইকোর্ট নির্দেশ দেয় যে, মেটা, এক্স (টুইটার) ও গুগলকে অবিলম্বে এই সব অবমাননাকর কনটেন্ট মুছে ফেলতে হবে এবং গডকড়ি চাইলে এই প্ল্যাটফর্মগুলির বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, একদিকে ইথানল বিতর্ক নিয়ে বিরোধীদের সাঁড়াশি আক্রমণ, অন্যদিকে সাধারণ যুবসমাজের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মুখে দাঁড়িয়ে গডকড়ির এই “পরবর্তী প্রজন্মকে দায়িত্ব ছাড়ার” বার্তা নিছক ট্রাস্টের কথা বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদলের আবহ তৈরি হতেই গডকড়ির এই মন্তব্য মোদি সরকারের অন্দরে বয়সের ভারসাম্য ও নতুনদের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নটি আরও একবার বড় করে তুলে দিল, যা দিল্লির শাসক শিবিরের অস্বস্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
