‘যো’–এর মুখ

হিরণ মিত্র
চিত্রশিল্পী
লেক মার্কেটের জনবহুল রাস্তা দিয়ে ছুটছি। হঠাৎ এক রমনী— তরুণীই বলা যায়, তার মুখে চোখ আটকে গেল। আশ্চর্য! এ কে? এই কি সেই যোগেন চৌধুরীর মডেল? ধন্দ যায় না। হুবহু মিল। এমন বাঙালি তনয়া আকছার উঠে আসত ‘যো’–এর রেখায়। ‘যো’ হচ্ছে যোগেন চৌধুরীর সংক্ষেপ। এই ‘যো’–কে চিনি যখন তিনি আমার যোগেনদা। সদাহাস্যময়, লাজুক। একটি দড়ির দোলায় দুলতে দুলতে, পেতলের জামবাটিতে মুড়িমাখা খাচ্ছেন মালেদের বাড়ির দাওয়ায়। মাল অর্থাৎ রাম মাল। তার এক পুত্র ভাস্কর হরভূষণ মাল। তাঁর বাড়ির অতিথি তখন যোগেনদা। খড়্গপুর শহরে শীত নামছে। ষাটের দশকের শেষ দিক। আমার স্কুল জীবন। যোগেনদার শিল্পপাঠ তখনও শেষ হয়নি। তিনি স্নাতক হন ১৯৬০ বা ১৯৬১ সালে। আমি ওই বছর সরকারি চারু বিদ্যালয়ে প্রবেশ করি। তাতে ওঁর একটা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। সেই সময় প্রবেশিকা পরীক্ষায় জলরঙের কাজ করে প্রমাণ দিতে হতো নিজের দক্ষতা। তার বহু আগেই ওঁর তত্ত্বাবধানে আমি জলরঙ রপ্ত করি। যোগেন চৌধুরী তখনই প্রবাদপ্রতীম জলরঙ ও রেখাচিত্র শিল্পী। অসাধারণ হাত, কাজের মুন্সিয়ানা। আমি বন–জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে তুলে নিচ্ছি তার কারিকুরি। শহর প্রান্তে আদিবাসী গ্রাম। সেই গ্রাম ঘেরা বন–জঙ্গল–জলা, ঝোপ–ঝাড়, সাপখোপের বাসা। আমরা ভোর হলেই রং–তুলি সাথে করে ছুটে যেতাম ওই আল–বিল ধরে। জলের মধ্যে, বিলের ধারে সবুজ সাপ সাঁৎ করে ঢুকে যেতো পায়ের তলায়। সেই সময় যখন তিনি মালদের বাড়িতে অতিথি। দুটো ধুতি, দুটো হাফহাতা সাদা শার্ট, দুটো গেঞ্জি— এই তাঁর সম্পদ। বিছানার চাদর বা তোষকের তলায় শোওয়ার আগে রেখে সমান করে নেওয়া। ইস্ত্রি করার প্রয়োজন পড়তো না। সামর্থও ছিল না। ওঁর সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ ছিল না। আরামে বসে দোলায় দুলছেন, ছবি ভাবছেন। অন্ধকার ঘর, যোগেনদা চুপচাপ শুয়ে আছেন। তার কালো ছায়ামূর্তি চোখে পড়ছে জানলার সামান্য আলোয়। ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকি। দু–চারটে ছবি নিয়ে প্রশ্ন করি। তিনি বিরক্ত না হয়ে উত্তর দেন। একটা স্নেহের পরশ কণ্ঠে। যে স্নেহ শেষদিন পর্যন্ত ছিল। কোনওদিন রাগতে দেখিনি। আমি খুব বেশি তেমন কাছে যাইনি। আমার ঘরানা নানা কারণে ভিন্ন হয়ে যায়। একবার ‘নান্দীমুখ’ পত্রিকায় একটা লেখা লিখতে হয়েছিল। লিখি ‘মূর্ত বিমূর্ত কথা’। ওঁর মূর্ততা আর আমার বিমূর্ততা।
যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম, ওঁর মুখ, মানুষ— তার আকার, বিকৃতি, সুস্থতা, অসুস্থতা। একটা তীব্রতর চলন। কখনও খুবই উগ্র, কখনও কোমল, শান্ত। দীর্ঘদিন রাজনীতির আঙিনায় সময় কাটিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মানুষ দেখেছেন বহু। এঁকেওছেন বহু। বহু বই উপহার দিয়েছেন। হাতের লেখা বেশ গোটা গোটা। আঁকছেন না লিখছেন বোঝা দুস্কর। কাজের মান ও মূল্য বেড়ে গেলেও অকাতরে ছবি বিলোতেন। কখনও কোনও কার্পণ্য ছিল না। আশ্চর্য! আমারও সংগ্রহে ওঁর বহু কাজ রয়েছে। পারিবারিক একটা সম্পর্ক ছিল, রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও।
রেখার আশ্চর্য একটা চলন নির্মাণ করেছিলেন। রেখাগুলো এঁকেবেঁকে কাগজ ভরে থাকে। বহু বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। সমাজ নিয়ে দৃশ্য –মন্তব্য একটা প্রিয় বিষয় ছিল। তীর্যক মন্তব্য, বাঁকা সমালোচনা মূলক বলা যায়। সমাজ ব্যবস্থাকে অপছন্দ করার প্রবণতা, বাম ঘেঁষা। পরের দিকে দক্ষিণ ঘেঁষা হলেও বাম চরিত্র মনে হয় না ভেতর থেকে পাল্টেছিল। সমালোচিত হয়েছেন। চুপ করে থাকতেই ভালোবাসতেন। আমার সঙ্গে শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল। স্নেহ করতেন খুবই। সেই পঞ্চাশের যোগেন চৌধুরী আমার স্মৃতিতে অমলিন রয়ে যাবেন। সেই ছায়া ছায়া, নিশ্চুপ হয়ে থাকা, চিন্তামগ্ন। আমি সন্তর্পণে দরজা ঠেলে ঢুকছি...।
হাত ও মন সতত সচল থাকত। ওঁর একটি সংগ্রহের নাম ‘চলতে চলতে’। এটি একটি দিন চিত্রলিপির মতো। প্রায় প্রতিদিন এঁকে চলেছেন মানুষ, পশুপাখি, ঘরবাড়ি, প্রকৃতি। কিন্তু আশ্চর্য, সব কিছুতেই ‘যো’–এর ছাপ। মানুষের হাতের লেখা যেমন তার নিজস্ব ছাপ নিয়ে তার মুখ বলে দেয়, যোগেনদার রেখাও তেমনি হাতের লেখার মতো— সতত লিখে বলা বা এঁকে বলা। তথ্য সংগ্রহ করে রেখে দেওয়া বহু পৃষ্ঠার একটি সংগ্রহ। কত অজস্র কাজ! বিস্ময় নিয়ে দেখতে থাকি। যেন একটা ধারাভাষ্য। যেখানে এক ছবি দুবার নেই। হঠাৎ মনে হবে একই রকম। কিন্তু আসলে তা নয়। ওঁর মন পাল্টাচ্ছে, বিষয় পাল্টাচ্ছে। কিন্তু ধরণ পাল্টাচ্ছে না। এই ধরণকে বিশ্বাস করা, ধরে রাখা বেশ কঠিন কাজ। এটা হয়ত রক্তে মিশে যায়। এ এমনই এক চর্চা বা অভ্যাস, যা সহজে রপ্ত করা যায় না। বিতর্ক হয়, মতভেদ হয়। তবুও তার অন্যথা হয় না। আসলে রেখা যখন একজন শিল্পীর বলিষ্ঠ আত্মীয় হয়ে ওঠে, তখন সহজে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে না। বিচ্ছেদ ঘটানো যায় না। বাইরে থেকে এই কথা বোঝানো কাউকে সম্ভব নয়। আমি রেখা–প্রেমী। রেখা অভ্যাসকারী বলে বুঝতে পারি, অনুভব করতে পারি এর মাহাত্ম্য, এর অপরিহার্যতা।
