প্রতিহিংসার রাজনীতি বনাম কর্মফল, শাসক-বিরোধী তরজায় সরগরম বঙ্গ রাজনীতি

সংবাদদাতা, কলকাতা: প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে বুধবার গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ। দুর্গাপুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রিতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ইডি দপ্তর থেকে বেরোতেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবারই ইন্দ্রনীলকে আদালতে তোলা হয়। ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ইন্দ্রনীল সেনকে পুলিশি হেপাজত দিয়েছে আদালত। গত ২৪ ঘণ্টায় ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারি নিয়ে শাসক-বিরোধী দুই শিবিরই প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। বিরোধীরা বলছে এই গ্রেপ্তারি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আর শাসকদল বলছে, অন্যায় করলে ছাড় পাবে না কেউ। এই নিয়ে সরগরম বঙ্গ রাজনীতি।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুলিশি পদক্ষেপের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, “ইডি ও কলকাতা পুলিশ নিজেদের এক্তিয়ারের মধ্যেই কাজ করেছে এবং প্রমাণ না থাকলে এই গ্রেপ্তারি হত না।” এর পাশাপাশি তিনি সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেন। তাঁর দাবি, মমতার সঙ্গে ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠতা ছিল, দুজন একই গাড়িতে চড়তেন, মঞ্চে একসঙ্গে গান গাইতেন। দুর্নীতির টাকার ভাগ মমতার কাছেও পৌঁছে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়ে শুভেন্দু বলেন, “পূর্বতন মন্ত্রিসভার আরও অনেকে একই পথে সম্পদ গড়েছেন এবং সামনে আরও বড় নাম আসবে।” ইডির একটি বিবৃতিতে ইন্দ্রনীলের সংস্থা অক্টেভ রেকর্ডস থেকে মমতার অ্যাকাউন্টে ৩০ লক্ষ টাকা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইন্দ্রনীলের রাজনৈতিক অতীত নিয়েও খোঁচা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় ইন্দ্রনীল সিপিএমের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আর ক্ষমতা বদলের পর তিনি নতুন সরকারের প্রশংসা শুরু করেছিলেন। শুভেন্দুর হুঁশিয়ারি, বিজেপি কোনও দুর্নীতি আড়াল করবে না।
মাঠে নেমেছেন দলের অন্য নেতারাও। চন্দননগর-ভদ্রেশ্বর এলাকায় গ্রেপ্তারির খবর পৌঁছতেই বিজেপি কর্মীরা মিছিল করে লাড্ডু বিলি করেন। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ ইউনেস্কোর নামে টিকিট বিক্রির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, পাপ কাউকে ছাড়ে না। বিজেপি নেতা গোপাল উপাধ্যায় একে দুর্গার আশীর্বাদে ইন্দ্রনীলের “সাম্রাজ্যের বিনাশ” বলে বর্ণনা করেন। সিঙ্গুরে ইন্দ্রনীলের বাগানবাড়ির সামনে বিক্ষোভও দেখিয়েছে বিজেপি।
গ্রেপ্তারির ধারা নিয়ে শাসক শিবিরের এই সুর নতুন নয়। মে মাসে ভবানীপুরের সভা থেকে শুভেন্দু আইন মেনেই দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল নেতাদের জেলে পাঠানোর কথা বলেছিলেন এবং সুজিত বসুর নাম উল্লেখ করেছিলেন। জুনের গোড়ায় রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ মন্তব্য করেছিলেন, গ্রেপ্তারের সিরিজ চলবে এবং জেলে জায়গা না হলে নতুন জেল বানাতে হবে।
বিরোধী শিবির: “প্রতিহিংসা” বনাম “বাছাই করা বিচার”
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে নিশানা করে বলেন, “বিবেক বিক্রি না করে লড়াই করা মানুষদেরই এখন জেলে যেতে হচ্ছে, অথচ চুরি-প্রতারণার অভিযুক্তরা বিজেপির পতাকা ধরলে সব অপরাধ থেকে রেহাই পাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, এটাই “মোদিজির নতুন ভারত”। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষও গোটা তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন। অভিষেক আগে নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাকেও রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত বলে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
মমতা-তৃণমূলের নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ইন্দ্রনীলের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মমতার লেখা গান ও সুরের জন্য ইন্দ্রনীলের সংস্থার অ্যাকাউন্ট ঘুরে যে রয়্যালটি গেছে, তা সম্পূর্ণ বৈধ। ইন্দ্রনীল নিজেও বলেছেন, ওই অর্থ রয়্যালটি। শোভনদেব অবশ্য এও বলেছেন, ইন্দ্রনীল অন্যায় করেছেন কি না তিনি জানেন না, দোষ প্রমাণিত হলে শাস্তি পেতে হবে। একই সঙ্গে তিনি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে ক্রমশ অগণতান্ত্রিক বলে অভিযোগ করেন।
বামেদের তরফে সিপিএম মুখপাত্র শতরূপ ঘোষ শুভেন্দুর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ইঙ্গিত দেন, কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে তা রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নির্ভর করছে। তাঁর দাবি, ইন্দ্রনীল যদি প্রতিদ্বন্দ্বী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরে যোগ দিতেন, তাহলে আজ তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হত না।
