বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

নাম বিভ্রাটে সেদিন দেওয়া হয়নি আসল খবর ! সিকি শতাব্দী পর স্বীকার করল সিআইএ

29 August, 2026 7:04 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

ওয়াশিংটন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১।

বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র (ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার) এবং পেন্টাগনে চার-চারটি অপহৃত বিমান আছড়ে ফেলে প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৩,০০০ নিরীহ মানুষের। সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির মূল মাস্টারমাইন্ড খালিদ শেখ মহম্মদকে ঘিরেই এবার সামনে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০০১ সালের হামলার ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে আমেরিকার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র কাছে এমন কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সংকেত এসেছিল, যা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল সংস্থাটি। সম্প্রতি এক বিস্ফোরক রিপোর্টে এই ইন্টেলিজেন্স গোঁজামিল এবং ছদ্মনামের জট না খোলার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ দুই দশক পেরিয়ে কেন আজ হঠাত্‍ ২৫ বছর পুরনো এই ঐতিহাসিক গোয়েন্দা ব্যর্থতার কথা স্বগর্বে নয়, বরং একপ্রকার বাধ্য হয়েই স্বীকার করতে হচ্ছে সিআইএ ও মার্কিন প্রশাসনকে ?

এর পেছনের আসল কারণ মার্কিন সামরিক আদালতের সাম্প্রতিক এক অভূতপূর্ব রায়। গ্লুয়ান্টানামো বে-র সামরিক আদালতের বিচারক লিন্ডা বি. রিচার্ডস ও বিচারক মাইকেল শ্রামা যৌথভাবে খালিদ শেখ মহম্মদের বিরুদ্ধে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI)-এর প্রায় ২০ বছর পুরনো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি বাতিল করে দিয়েছেন।

আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াটারবোর্ডিং সহ সিআইএ-র অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং নিপীড়নের মুখে পড়ে খালিদ যে বয়ান দিয়েছিল, তা কোনো স্বেচ্ছায় দেওয়া স্বীকারোক্তি নয়। ফলে বিচারে এই তথাকথিত ‘স্বীকারোক্তি’ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। মামলা যখন ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে গেল এবং নির্যাতন করে প্রমান সংগ্রহের আইনি ভিত্তি ধসে পড়ল, ঠিক তখনই নিজেদের পুরনো গোয়েন্দা তথ্যের রেকর্ড ও ফাঁকফোকর খতিয়ে দেখতে বাধ্য হয় মার্কিন তদন্তকারীরা।

যেভাবে মেলানো যায়নি গোয়েন্দা তথ্যের সুতো

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, ৯/১১ হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে সিআইএ-র কাউন্টারটেররিজম সেন্টার (CTC) একটি গোপন ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট পেয়েছিল। তাতে স্পষ্ট লেখা ছিল, ‘মুক্তার’ (Mukhtar) ছদ্মনামটি আর কারর নয়, বরং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হামলার খলনায়ক খালিদ শেখ মহম্মদের। সেই বছর সিআইএ-র বিভিন্ন নথিতে একাধিকবার ‘মুক্তার’ নামটি উঠে এসেছিল। মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে এও বলা হয়েছিল যে, এই ‘মুক্তার’ নামক ব্যক্তিটি আমেরিকার মাটিতে নাশকতামূলক হামলা চালানোর জন্য সন্ত্রাসী সংগ্রহ ও তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

অথচ ১৯৯৬ সালেই ১৯৯৩-এর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রথম বোমা হামলার চক্রান্তে জড়িত থাকার অভিযোগে খালিদ শেখ মহম্মদের বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করা হয়েছিল। কাতার থেকে পালিয়ে তিনি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ঘাঁটি গাড়েন এবং আল-কায়েদার প্রচার বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে আফ্রিকায় মার্কিন দূতাবাসে হামলার পরও ‘আবদুর রহমান আল-ঘামদি’ নামে খালিদের আরও একটি ছদ্মনাম খুঁজে পেয়েছিল সিআইএ।

এতগুলো স্পষ্ট সংকেত সত্ত্বেও সিআইএ-র গোয়েন্দারা একাধিক বিন্দুর সংযোগ ঘটাতে (Connect the dots) পুরোপুরি ব্যর্থ হন। ‘মুক্তার’ ছদ্মনামের আড়ালে যে খোদ খালিদ শেখ মহম্মদই আমেরিকায় জঙ্গি পাঠানোর ছক কষছে, তা তারা বুঝতে পারেনি। শুধু তাই নয়, রামজি ইউসেফ, আলি আব্দুল আজিজ আলি কিংবা হাশিম আব্দুল আজিজের মতো আল-কায়েদার শীর্ষ কাণ্ডারিরা যে খালিদের নিজের খুড়তুতো-জেঠতুতো ভাই, সেই পারিবারিক তথ্যও সিআইএ গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে যায়!

হামলার পরই উন্মোচিত হয় জট

৯/১১-র রক্তক্ষয়ী ঘটনার পরেই সিআইএ ঘুম থেকে জাগে এবং বুঝতে পারে যে ‘মুক্তার’ এবং খালিদ শেখ মহম্মদ একই ব্যক্তি। জানা যায়, খালিদ যে স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করতেন, সেটি ইয়েমেনি সন্ত্রাসী রামজি বিন আল-শাইবও ব্যবহার করত। ওই একই ফোন থেকে ৯/১১ হামলার অন্যতম অভিযুক্ত জাকারিয়াস মুসাউইর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল।

২০০৩ সালে পাকিস্তান থেকে খালিদকে যৌথ অভিযানে গ্রেফতার করে আমেরিকা। পরবর্তীতে ২০০৬ সাল থেকে তিনি কিউবার গুয়ান্তানামো বে-র ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি রয়েছেন। তদন্তকারীদের জেরায় খালিদ একসময় দাবি করেছিলেন, তিনি “এ থেকে জেড (A-to-Z)” ৯/১১ হামলার পুরো নীল নকশা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু আজ সেই স্বীকারোক্তির আইনি বৈধতা সিআইএ-র নিজেদের টর্চার সেলের অত্যাচারের কারণে আদালতে বাতিল হয়ে গিয়েছে। অত্যাচার চালিয়ে তথ্য বের করার রাজনীতি বানচাল হতেই, সিআইএ-র আদি গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং গাফিলতির কঙ্কালসার চেহারাটা আন্তর্জাতিক মহলে ফের একবার টেনে বার করতে বাধ্য হলো মার্কিন বিচারব্যবস্থা।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee