বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
সামশেরগঞ্জে বিজেপি কর্মী খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত এনকাউন্টার গাইঘাটা ধর্ষণ কাণ্ডে এনকাউন্টার করে অভিযুক্তের মৃত্য়ু সরশুনা কাণ্ডে অভিযুক্তদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ একই দিনে জোড়া এনকাউন্টার রাজ্য়ে

নাজা অথবা সামান্য ক্ষতির খতিয়ান

27 October, 2026 6:51 PM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

দুই ইজরায়েলি পরিচালকের  ৮০ মিনিটের  এই তথ্যচিত্রটি সম্প্রতি যখন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়, তখন দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে টানা ২৫ মিনিট ধরে  করতালি দিয়ে ছবিটির নির্মাতাদের অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ‘‌নাজা’‌ এবার বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে। ভিয়েনার একটি প্রেক্ষাগৃহে এই ছবি দেখে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন অর্ণব চক্রবর্তী।

“Tel Aviv is a very modern city, it doesn’t have any old parts” প্রথমেই এই লেখা ভেসে ওঠে স্ক্রিনে। তার ঠিক পরেই আমরা দেখতে পাই একটা ‘আর্কাইভাল ফুটেজ’— গত শতকের শুরুর দিকে যখন এই আধুনিক শহর সবে তৈরি হচ্ছিল তখন কেমন ভাবে ওখানকার আদি বাসিন্দাদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয় পার্ক, হাউজিং কমপ্লেক্স এবং ঝকঝকে সরকারি অফিসের জন্য। যার মধ্যে পরেছে ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (IDF)-এর হেড কোয়ার্টার্সও।
পুরো ছবিটাই তোলা তেল আবিবের উঁচু উঁচু বাড়ির ছাদের ওপর থেকে, রাতের আঁধারে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে!‌ যাতে ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্সের সেনা বা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নজর এড়ানো যায়। অন্যদিকে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে একটু আধটু দেখা গেছে অতি সাধারণ ইজরায়েলি বাড়ির অন্দরমহলের খাবার টেবিল, ড্রয়িং রুম, টেলিভিশন সেট ইত্যাদি।
যখন একজন আইডিএফ সৈনিক বোঝাচ্ছে যে, গাজাতে খাবারের লাইন থেকে যখন কেউ সরে আসে তখন তাদের কী ভাবে গুলি করে দেওয়া হয়, তখন পেছনে একটা বাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে খাওয়ার টেবিলে পড়ে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করছেন এক মহিলা। যখন একজন গোয়েন্দা কর্তা বোঝাচ্ছেন, ফোনে আড়ি পেতে, মেসেজ পড়ে বা লোকেশন ট্র‌্যাক করে কীভাবে ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্স তাদের লক্ষ্য স্থির করে, ঠিক তার পাশেই তখন খোলা জানলা দিয়ে দেখা যায় ইজরায়েলি পারিবারিক জীবন— কেউ ড্রয়িং রুমে বসে গল্প করছেন আবার কেউ যোগা বা ব্যায়ামে ব্যস্ত। এই সবই ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে সিলুয়েট বা ‘‌আউট ফোকাসে’‌। আসলে ইজরায়েল সম্পর্কে সারা পৃথিবীর ধারণাও তো খানিকটা এরকমই— ঝাপসা, আলো–আঁধারি। ইজরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি, মোসাদ বা ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্সের বিদেশ নীতিতে তার প্রভাব, বিশেষত আমেরিকার সঙ্গে, সে সবটাই যেন কনস্পিরেসি থিওরি আর ওয়ার ক্রাইমের মাঝামাঝি পর্যায়।
এই ছবিটার মূল বিষয় হল ল্যাভেন্ডার। এটি মূলত ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর ব্যবহার করা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। এটি একটি টার্গেটিং ডাটাবেস সিস্টেম। যা গাজায় হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের সদস্যদের শনাক্ত করতে ও তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে ব্যবহৃত হয়।
তবে যে কোনও AI সফ্টওয়্যারের মতো ল্যাভেন্ডারও সম্ভাবনার ওপরই কাজ করে। অর্থাৎ তার পক্ষে পুরোপুরি একশো শতাংশ সঠিক হওয়া সম্ভব নয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইজরায়েল সরকার তাদের অভিযানে ভুলের বিষয়টি কিছুটা মেনেও নিয়েছে। একজন সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছেন, সরকারি ভাবে তাদের বলা হয়েছে, এই যুদ্ধে বেসামরিক বা অনিচ্ছাকৃত ক্ষতির পরিসংখ্যান ২০/‌২০। মানে নাজা ২০ এবং নেজেক আগাভি অর্থাৎ হামলা চালানোর সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে বা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হার ২০। অর্থাৎ প্রতি হামাস অভিযানে মরতে বা আক্রান্ত হতে হয়েছে অন্তত ২০ জন সাধারণ মানুষকে। আর সেটা হলেই ধরে নেওয়া হয়েছে অভিযান সফল! সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ইউভাল আব্রাহাম যখন জিজ্ঞেস করেন, এই নাজাতে কি বাচ্চা, মহিলা, বুড়ো সবাই এক?‌ তখন দর্শক জানতে পারে, হ্যাঁ, সবাই এক নাজা। এই ভাবেই ছবির মাধ্যমে বিভিন্ন সামরিক কৌশল ও পরিসংখ্যান সামনে আসতে থাকে। তার ঠিক পাশাপাশি সমান্তরালভাবে ছাদের ওপর থেকে ইজরায়েলি মধ্যবিত্ত জীবনের টুকরো টুকরো ঝলক, কখনও জানলার ফাঁক দিয়ে, কখনও ক্যাফের বাইরে, ফুটপাথে, ট্রাফিক লাইটের হালকা আলোয় চোখ ছুঁয়ে যায়। কেবল শেষের ২ মিনিট আমরা গাজার একটি ভাইরাল দৃশ্য দেখতে পাই। একজন লোক তার ছেলে–মেয়েকে খুঁজছে, কংক্রিটের স্তূপের নিচে দুই নাজা।
এই ছবিটি রিলিজ হওয়ার পরে ইউভাল আব্রাহাম আর র‌্যাচেল সোরেকে ইজরায়েলি নাগরিকতা বাতিলের ভয় দেখানো হয়। কিন্তু তাঁরা ভয় পেয়ে পিছু হটে যাননি। বরং ছবিটি কয়েকটা ফেস্টিভ্যালে দেখানোর পর চলতি মাসেই আন্তর্জাতিকভাবে রিলিজ করেছেন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এভাবেই একটা ভিয়েনিজ সিনেমাতে এই ছবিটি দেখি আমরা। ছোট্ট প্রেক্ষাগৃহ, আড়াইশো দর্শকসন, ৮/৩ মিটারের পর্দা। কিন্তু এই ছবি প্রদর্শনের দিন প্রেক্ষাগৃহ কানায় কানায় ভর্তি। একে রবিবার রাত। তার ওপর পরের দিন অস্ট্রিয়ার জাতীয় ছুটি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবির শেষের ২ মিনিটের স্ক্রোল। কোনও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নেই, অথচ একটা লোকও উঠে যাচ্ছে না!‌ কোনও ফিসফিস বা প্যকেটের খচমচও শোনা যাচ্ছে না। যখন পর্দা কালো হয়ে গেল, জ্বলে উঠল হলের সব আলো, তার পরেও এক মিনিটের মতো চূড়ান্ত নিস্তব্ধতা!‌ এরপর আস্তে আস্তে কিছু দীর্ঘশ্বাস, ফোঁপানি আর কিছু বিদ্রূপাত্মক হাসির আওয়াজ শোনা গেল।
— এই ছবির সহ প্রযোজক দ্য গার্জিয়ান–এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর আগামী নভেম্বর থেকে সারা দুনিয়ার দর্শক সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রযোজক সংস্থার নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেখতে পাবেন ছবিটি। এই ছবি free-তে। বড় কথা হল ইজরায়েল এবং প্যালেস্টাইনেও এই ছবি দেখানোরও চেষ্টা করছে তারা।‌‌

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik