ইরান সংকটের মাঝেই ভারতের জিডিপি ছুঁলো ৭.৮%
নয়াদিল্লি : পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের দাবানল।
তার ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর পর ‘শুল্কবোমা’র ধাক্কা। দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন অনিশ্চয়তার গভীর আঁধারে ডুবতে বসেছে, ঠিক তখনই সব আশঙ্কা ও নেতিবাচক জল্পনাকে ধূলিসাৎ করে বিশ্বমঞ্চে রাজকীয় উত্থান ঘটালো ভারত। ভূ-রাজনৈতিক মহাপ্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বুলেট গতিতে ছুটছে দেশের অর্থব্যবস্থা। সোমবার, ৩১ অগস্ট প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) বৃদ্ধির হার পৌঁছে গিয়েছে ৭.৮ শতাংশে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনুমান (৭.১ শতাংশ) তো বটেই, সরকারের নিজস্ব প্রত্যাশাকেও বহুদূর পেছনে ফেলে দিয়েছে এই অভাবনীয় উত্থান। যেখানে গত ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে (জুন) বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৯ শতাংশ, সেখানে এ বছর একই সময়ে তা দাঁড়িয়েছে ৭.৮ শতাংশে। অর্থাৎ, বছর থেকে বছরের (Year-on-Year) হিসাবে ভারতীয় আর্থিক বৃদ্ধির পারদ যে একলাফে অনেকটাই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
যুদ্ধের মেঘ বনাম ভারতের সূর্যোদয়
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের সূচনার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড ওয়েল বা অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ভারতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব চরম ক্ষতিকর হতে পারতো বলে সতর্ক করেছিলেন বাজার বিশ্লেষকরা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের শেষ ত্রৈমাসিকেও (জানুয়ারি-মার্চ) জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৮ শতাংশ। ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরের ত্রৈমাসিকেও যে ভারত এই অভূতপূর্ব হার বজায় রাখতে পারবে, তা স্বপ্নেও ভাবেননি বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
পরিসংখ্যান সামনে আসতেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ সামাজিক মাধ্যম এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ এক বার্তায় জানান, আন্তর্জাতিক তীব্র প্রতিকূলতার মাঝেও চলতি অর্থবর্ষে ভারতের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের মূলে রয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য জেদ।
অন্যদিকে, সংবাদ সংস্থা এএনআই (ANI)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই সাফল্যকে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির জয় হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি তীব্র কটাক্ষের সুরে জানান, এই রেকর্ড বৃদ্ধি সেই সমস্ত সমালোচক ও শুভানুধ্যায়ীদের জন্য একটা বড় শিক্ষা, যাঁরা প্রতিনিয়ত দেশের অর্থনীতি নিয়ে ‘গেল গেল’ বলে আর্তনাদ ও বিভ্রান্তি তৈরি করে থাকেন। বিরোধীদের এই ‘গেল গেল’ রবকে হতভম্ব করে দিয়েই ভারত নিজের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের জয়
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মার্কিন শুল্ক কাঠামোর কড়াকড়ি সত্ত্বেও ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার পারদ নামেনি। উল্টে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও মহাকাশ গবেষণার মতো কৌশলগত ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত সার্বিক পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। একই সঙ্গে সরকারের মূলধনি ব্যয় বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ শিল্পে পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানি ক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো জোয়ার লক্ষ্য করা গিয়েছে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক মন্দা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহেই ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির এই গতি প্রমাণ করল— দেশের অর্থনীতির বুিয়াদ কতটা মজবুত। তবে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম আগামী দিনে পরিবহন খরচে কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার, বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকেও অর্জিত এই বুলেট স্পিড ধরে রাখতে পারে কি না ভারতীয় অর্থনীতি।
