বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেপাজতে ইন্দ্রনীল সেন লাইসেন্স ছাড়া ওড়ানো যাবে না ফানুস রঞ্জিতে জয়ের হ্যাটট্রিক বাংলার কলকাতায় উদ্ধার ১১০ কেজি নিষিদ্ধ বাজি

১৯৭১-এ আজকের দিনে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ওড়িশায় মৃত্যু হয়েছিল ১০ হাজার মানুষের

29 October, 2026 5:12 PM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

প্রকৃতির রুদ্ররূপ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার সাক্ষী হয়ে রয়েছে ওড়িশার ইতিহাস। আজ, ২৯ অক্টোবর, যখন ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, তখন ঠিক ৫৫ বছর আগের এক ভয়াল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের স্মৃতি ফিরে আসে। ১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া প্রবল ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়েছিল তৎকালীন ওড়িশা উপকূলে। প্রবল বাতাস, বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাস এবং বন্যার মিলিত আঘাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার। ধ্বংস হয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি, বিপর্যস্ত হয়েছিল জনজীবন।

একই ক্যালেন্ডারের তারিখ যেন ইতিহাসের দু’টি ভিন্ন সময়কে পাশাপাশি এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে ১৯৭১ সালের বিপর্যয় আর আজকের অর্ণবের পরিস্থিতি এক নয়। ১৯৭১ সালের ঝড়ে ঠিক কী ঘটেছিল, কেন এত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় কতটা বদল এসেছে— সেই ইতিহাস ফিরে দেখা জরুরি।

২৯ অক্টোবরের সেই ভয়াবহ রাত

১৯৭১ সালের ২৬ থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়টি ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ২৯ অক্টোবর ঝড়ের তীব্রতা চরমে পৌঁছায়। পরদিন, ৩০ অক্টোবর ভোরে, ওড়িশার পারাদ্বীপের কাছে উপকূল অতিক্রম করে ঝড়টি। আবহাওয়া সংক্রান্ত ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ঝড়ের সর্বোচ্চ বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৫০–১৭০ কিলোমিটার ছিল।

কিন্তু শুধু ঝোড়ো বাতাসই এই বিপর্যয়ের কারণ ছিল না। সমুদ্রের জল ফুলে উঠে উপকূলের নিচু এলাকাগুলিতে ঢুকে পড়েছিল। কোথাও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কয়েক মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। নদী ও খাল বেয়ে সেই জল আরও ভিতরে ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় কিংবা ঘর ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার আগেই জলের স্রোতে আটকে পড়েন।

কেন মৃত্যু হয়েছিল ১০ হাজার মানুষের?

এই বিপুল প্রাণহানির পিছনে ছিল কয়েকটি কারণের সম্মিলিত প্রভাব।

প্রথমত, জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহতা। উপকূলবর্তী নিচু জমি, নদীর মোহনা এবং সমুদ্রের কাছাকাছি বসতিগুলি দ্রুত প্লাবিত হয়েছিল। ঝড়ের সঙ্গে সমুদ্রের জল ঢুকে পড়লে শুধু বৃষ্টির জল নয়, প্রবল স্রোতও মানুষের জীবন বিপন্ন করে।

দ্বিতীয়ত, দুর্বল ঘরবাড়ি ও আশ্রয়ের অভাব। উপকূলের বহু মানুষ কাঁচা বাড়িতে বসবাস করতেন। ঝড়ের প্রবল হাওয়ায় বাড়ি ভেঙে পড়া এবং জল ঢুকে পড়ার ফলে নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ কমে গিয়েছিল।

তৃতীয়ত, পূর্বাভাস ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা। ১৯৭১ সালে আজকের মতো উপগ্রহচিত্র, দ্রুত আবহাওয়া-বার্তা প্রচার, মোবাইল ফোন কিংবা বিস্তৃত বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকাঠামো ছিল না। ঝড়ের প্রকৃত তীব্রতা এবং কোথায় কতটা ক্ষতি হতে পারে, তা নির্ধারণ করাও অনেক কঠিন ছিল। ওড়িশার ঐতিহাসিক ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৭১ সালের ঝড়ের সময় উপকূলের সর্বত্র বাতাসের গতি বা জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা মাপার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না।

শুধু মানুষ নয়, ধ্বংস হয়েছিল গোটা জনজীবন

ওড়িশা সরকারের Odisha Relief Code-এ ১৯৭১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির যে বিবরণ রয়েছে, তা ভয়াবহ। প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছিল। প্রায় ছয় লক্ষ একর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছিল প্রায় ৫৯ লক্ষ মানুষের জীবনে।

বিশ্বব্যাঙ্কের একটি দুর্যোগ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছিলেন এবং প্রায় আট লক্ষ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কৃষিজমি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ক্ষতিও ছিল ব্যাপক।

৫৫ বছরে কতটা বদলেছে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার ব্যবস্থা?

আজকের অর্ণবের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ঝড়ের তুলনা করলে একটি বড় পার্থক্য স্পষ্ট হয়— প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু তার অভিঘাত কমানো সম্ভব।

২০২৬ সালের অর্ণবের ক্ষেত্রে ঝড় উপকূল অতিক্রম করার আগে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা থেকে এক লক্ষ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রাণহানি কমাতে সাহায্য করেছে।

তবে সতর্কবার্তা পৌঁছানোই যথেষ্ট নয়। সেই বার্তা বুঝে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা, উপকূলের দুর্বল বাড়িগুলিকে সুরক্ষিত করা, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি এবং বিপর্যয়ের পরে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা পরিষেবা চালু করাও জরুরি।

১৯৯৯ সালের সুপার সাইক্লোনের পর ওড়িশায় দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আজকের প্রস্তুতির পিছনে রয়েছে সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং অতীতের বিপর্যয় থেকে পাওয়া শিক্ষা।

ইতিহাসের সতর্কবার্তা

১৯৭১ সালের ২৯ অক্টোবরের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা শুধু বাতাসের গতিবেগ দিয়ে বিচার করা যায় না। কোথায় ঝড় আছড়ে পড়ছে, কতটা জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে, কত মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং তাঁদের কত দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরানো যাচ্ছে— প্রাণহানির মাত্রা নির্ধারণে সব ক’টি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

অর্ণবের মতো ঘূর্ণিঝড়ের দিনে তাই ৫৫ বছর আগের সেই বিপর্যয়কে স্মরণ করা শুধুই ইতিহাসচর্চা নয়। এটি দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি কতটা জরুরি, তারও শিক্ষা। প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ে প্রযুক্তি ও পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, কার্যকর প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা।

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha