চোরবাগান বিপর্যয়: থিমের ধারণা কি মুছে যাবে বাঙালির দুর্গাপুজোয়, খুঁজে দেখল The Anchor Bengal

সংবাদদাতা, কলকাতা: শনিবার, দুর্ঘটনার ৬ দিন পর পুলিশি নিরাপত্তায় চোরবাগানের প্রতিমার নিরঞ্জন দেখল এই শহর। এই চোরবাগান বিপর্যয়ের পর অনেকগুলি বিষয় নিয়ে চর্চা হচ্ছে শিল্পীমহলে। গত কয়েকবছর ধরে সুশান্ত পাল, ভবতোষ সুতারের মতো শিল্পী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সারা পৃথিবীতে শিল্প দেখতে গেলে পয়সা দিয়ে দেখতে হয়। দুর্গাপুজোতে কেন টিকিট হবে না? গতবছর টালা প্রত্যয় যে টিকিট কালচার শুরু করেছিল, সেই পথে হেঁটেছে অনেক ক্লাবই। কিন্তু পয়সা দিয়ে বাঙালি দুর্গাপুজো দেখবে, এই ধারণার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন আরেক শিল্পী সনাতন দিন্দা। তিনি জানান, দুর্গাপুজোর শিল্পীরা এমন কোনও শিল্প বানাচ্ছে না, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে। পাবলিক আর্ট কখনও মানুষকে পয়সা দিয়ে দেখানো যায় না। চোরবাগানের বিপর্যয়ের পর অনেক তথ্য উঠে আসছে। প্রশাসনের গাফিলতি, শিল্পীর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরির চেষ্টা, একাধিক অভিযোগ এসেছে। বাংলার দুর্গাপুজোয় প্রথমবার ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনাচক্রে এবার চোরবাগানের শিল্পী ছিলেন সুশান্ত পাল। চোরবাগানের ঘটনার পর থিম পুজোর ধারণা মুছে যেতে পারে এই বাংলায়? কী ভাবছে শিল্পীমহল? শনিবারই শেষ হল রাজ্যের প্রতিমা নিরঞ্জন। আর তারপর এরই কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করল The Anchor Bengal।
একজন শিল্পীর ভাবনা কোথা থেকে শুরু হয়? একটি পাবলিক আর্ট করতে গেলে সবার আগে স্থান নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চোরবাগানের মতো সংকীর্ণ গলির মধ্যে পুজো। এখানে কীভাবে ২৫ ফুটের প্রতিমা এবং অল্প পরিসরে মন্ডপ তৈরি করলেন? আর পুলিশ যখন নিরাপত্তা দেখতে এসেছিল, তখন কীভাবে এই পুজো অনুমতি পেল? এমনই অভিযোগ করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। খিদিরপুর যুবক সঙ্ঘের এবারের থিম শিল্পী পাপাই সাঁতরা The Anchor Bengal-কে জানালেন চোরবাগান পূজামণ্ডপের বিপর্যয় নিছক কোনও শিল্পভাবনা বা আলোর অভাবের ফল নয়। এটা পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা ও গাফিলতি। সিভিক ভলান্টিয়ার ও এজেন্সিকে দিয়ে মণ্ডপ নিয়ন্ত্রণ এবং সংকীর্ণ যাতায়াতের গেট সম্পর্কে কেন পুলিশ আগে সতর্ক করেনি? ক্লাব কর্তাদের বিভ্রান্তিকর ঘোষণায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। উৎসবের আনন্দ বিষাদে পরিণত হওয়ার এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা করেন পাপাই।
চোরবাগান দুর্ঘটনার দিনই তদন্ত কমিটি গড়ার আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি তৈরি করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ক্লাব কর্তাদের। মাইকে যাদের ঘোষণা শুনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তাদেরকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতিমা নিরঞ্জনের অনুমতি দিলেও মণ্ডপ হুবহু এক রাখতে নির্দেশ দিয়েছে তদন্ত কমিটি। চোরবাগান সর্বজনীনের টিকিট অনলাইনে কিনতে পাওয়া যাচ্ছিল, এই অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছিল। যদিও সেই ভিআইপি টিকিট দিয়ে প্রবেশ করাতে অস্বীকার করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনার পরেও সেই টিকিট কেলেঙ্কারি নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। বাঙালি টাকা দিয়ে শিল্প দেখতে যায়নি। কিন্তু চোরবাগান কেড়ে নিয়েছে রাজ্যের ১৯টি তাজা প্রাণ।
এই ঘটনার পর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত শিল্পী সুশান্ত পাল। The Anchor Bengal-কে জানালেন, আগামী বছর পুজো করবেন কিনা, নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, “এটি একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যা কলকাতার দুর্গাপুজোর জন্য একেবারেই কাম্য ছিল না। ঘটনার দিন সাড়ে ৩টে পর্যন্ত মণ্ডপেই ছিলাম। তখনই যে সংখ্যক মানুষের ভিড় ছিল যা দেখে অবাক হই।” সুশান্ত জানান, “লালবাজারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা এসেছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কী কী করণীয়, বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। দর্শনার্থীরা পুজো দেখছিলেন কিন্তু ছবি তুলতে গিয়ে ঠাকুরের সামনে আটকে যাচ্ছেন, তা দেখে পুলিশই পরামর্শ দিয়েছিল কাপড় দিয়ে লেয়ার করে দিতে। যাতে যেমন খুশি যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে উপর থেকে ফটো তোলা না যায়। শনিবার দুপুরেই সেই মতো করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর হঠাৎই এই দুর্ঘটনা ঘটে।” তিনি জানান এখনও যেন ঘোর কাটেনি। মানসিক ভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। দুর্গাপুজোর অষ্টমী, নবমী ও দশমী কাটল সম্পূর্ণ একা, গৃহবন্দি ছিলেন। চোরবাগান পুজোর ভয়াবহ বিপর্যয় আজও তাঁকে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। চলতি বছর তিনি মোট চারটি পুজোর থিমের কাজ করেছিলেন। চোরবাগানের অপরাধবোধ থেকেই তিনি নিজেকে কোনোভাবেই ক্লিনচিট দিতে পারছেন না। দুঃসহ এই স্মৃতির ভার বইতে বইতে পুজো বা থিমশিল্পের দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ভেঙে পড়ে শিল্পীর আক্ষেপ, “আর কখনও পুজোর থিম করব কী না জানি না।”
এই বছর সল্টলেক এফডি ব্লকের থিম শিল্পী ছিলেন প্রশান্ত পাল। চোরবাগান কাণ্ডে তিনি সরাসরি কমিটি, পুলিশ, শিল্পীর অসতর্কতাকেও দোষারোপ করলেন। প্রশান্ত পাল জানান, “চোরবাগানের ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, দুঃখজনক। প্রশাসনিক স্তর থেকে সব সময় চেকিং হয়। আমার এই বিষয়টা খুব অবাক লাগে, চোরবাগানের মতো পুজোয় এত ছোট লাগে। দীর্ঘদিনের ধরে তুলে বলে এসেছি, এত অন্ধকার। দুর্গাপুজো হবে আলো ঝলমলে। এটা পাবলিক আর্ট। পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো থাকা দরকার। এর জন্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রয়োজন হয়। টিকিট কেটে দুর্গাপুজোকে আমি সমর্থন করি না। বিদেশের শিল্পকে পুজোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে। দুর্গাপুজো সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে হয়। বিভিন্ন ধরনের লোক আসবে।”
চোরবাগানের মতো জায়গায় পুজো নিয়ে আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল। শিল্পী প্রশান্ত পাল বলেন, “কলকাতায় গলির মধ্যে পুজো হচ্ছে। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট করা খুব প্রয়োজন। চোরবাগানের ম্যানেজমেন্টের গাফিলতিও হয়েছে। থিম পুজো হবেই। সারা বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে আমাদের দুর্গাপুজো। এর সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাটাও মাথায় থাকা উচিত। কিন্তু শিল্পীরা কোথায় আর্ট দেখাচ্ছে, সেই মাধ্যমটা কেউ কেউ ভুলে যাচ্ছে। চোরবাগানের পুজো সোশ্যাল মিডিয়ায় তিন চারদিন ধরে হাইপ হয়েছে। তবে চোরবাগানের কথা ভেবে বাকি পুজোর সঙ্গে তুলনা করলে হবে না। শিল্পী প্রশান্ত পাল জানান, ৯৯ শতাংশ কমিটি নিরাপত্তার বিষয়টা মাথায় রাখে। ১ শতাংশ হয়তো এটা মাথায় রাখেনি। তিনি বলেন, “চোরবাগানের ক্ষেত্রে কমিটি, পুলিশ, শিল্পী সবারই কিছু হয়তো গাফিলতি ছিল। দুর্গাপুজোকে যদি আর্ট গ্যালারি মনে করে, তা হলে সমস্যা হবে।”
