ব্রিকস কোনও দেশের বিরুদ্ধে নয়, দশ দফা রূপরেখা মোদির
নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর: নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। শুরুতেই গ্লোবাল সাউথ দেশগুলির অধিকার এবং বিশ্ব পরিচালনায় তাদের জোরালো ভূমিকার পক্ষে সরব হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, উন্নয়নশীল দেশগুলিকে কেবল নিয়ম মেনে চলা ‘রুল-টেকার’ হওয়ার ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নীতি নির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি বা ‘রুল-শেপার’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতিতে উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি বিশ্ব শাসনব্যবস্থার মধ্যে থাকা বৈষম্যের ছবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বের নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সময় গ্লোবাল সাউথ বা পিছিয়ে থাকা দেশগুলি সামনের সারিতে থাকলেও, বড় কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের জায়গা হয় একেবারে পেছনের সারিতে। বিশ্ব শাসনব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোকে একটি পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করে তিনি জানান, ক্ষমতার সিংহভাগ নির্দিষ্ট কিছু শীর্ষ দেশের কুক্ষিগত রয়েছে, অথচ সিদ্ধান্তের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয় নিচের স্তরের দেশগুলিকেই। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ব্রিকস কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নীতিতেই বিশ্বাসী। তবে এদিন ব্রিকসে পহেলগাঁও হামলার নিন্দা করা হয়। যার ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে চাপ বাড়ল পাকিস্তানের।
আগামী দুই দশকের জন্য একটি নতুন ও দূরদর্শী এজেন্ডা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রতিনিধিত্ব, সংবেদনশীলতা এবং নিয়ম তৈরি — এই তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে দশ দফা রূপরেখা পেশ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি অবিলম্বে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ বা ইউএনএসসি সংস্কারের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য, বিশ্ব অর্থনীতিতে যে দেশগুলি চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করছে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের ভোটাধিকার এবং নীতি নির্ধারণেও উপযুক্ত স্থান পাওয়া উচিত।
ব্রিকসের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং নেতৃত্বের পরিবর্তনের ফলে কাজের গতি যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য একটি নির্দিষ্ট ‘ট্রয়োকা’ ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি, গৃহীত সিদ্ধান্তগুলির অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল ভান্ডার তৈরির কথাও বলেন তিনি। পশ্চিম এশিয়ার সংকটের জেরে সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে ব্রিকস দেশগুলির মধ্যে একটি ‘নাবিক জরুরি সহায়তা নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি, যা বিপদের দিনে নাবিকদের চিকিৎসা সহায়তা এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় সাহায্য করবে। এদিকে ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে সমস্ত সদস্য দেশের মধ্যে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট কোনও দেশের নাম না করে যেকোনও ধরনের আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে এই যৌথ বিবৃতিতে। ভারতের এই দক্ষ কূটনৈতিক মধ্যস্থতা বিশ্বমঞ্চে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
