বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

বনেদি বাড়ির পুজো: ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় মায়ের মুখে জ্বলে ওঠে প্রশান্তির আলো

16 October, 2026 6:26 PM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

লিখেছেন নন্দিতা দেবনাথ

ষষ্ঠীর সন্ধ্যা নামতেই বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান যেন কয়েকশো বছরের ইতিহাসকে বুকে নিয়ে জেগে ওঠে। প্রাচীন বাড়ির মোটা থাম, খিলান দেওয়া দরজা, লাল মেঝে আর ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় তৈরি হয় এক অন্য সময়ের আবহ। বাইরে কলকাতার রাস্তায় তখন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে মানুষের ঢল, আলোর রোশনাই, মাইকে গান। কিন্তু বনেদি বাড়ির অন্দরে পুজোর সন্ধ্যা চলে নিজস্ব ছন্দে, নিজস্ব ঐতিহ্যে।

ঠাকুরদালানে ধূপের গন্ধ, প্রদীপের শিখা আর শঙ্খধ্বনি মিলে তৈরি করে এক নিবিড় পুজোর পরিবেশ। প্রতিমার মুখে আলো পড়তেই মনে হয়, দেবী যেন এই বাড়িরই মেয়ে, এক বছরের অপেক্ষা শেষে বাপের বাড়িতে ফিরেছেন। বাড়ির প্রবীণ সদস্যরা কেউ বসেছেন পুরনো কাঠের চেয়ারে, কেউ বা নীরবে দেখছেন পুজোর আয়োজন। তাঁদের চোখে শুধু বর্তমানের আনন্দ নয়, জড়িয়ে রয়েছে শৈশবের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া মানুষজন আর একের পর এক পুজো পার করে আসার দীর্ঘ ইতিহাস।

সন্ধ্যার আলোয় বাড়ির মহিলাদের শাড়ির রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কারও পরনে সাবেকিয়ানা মাখা গরদ, কারও গায়ে বেনারসি। ছোটরা নতুন পোশাকে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়। আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, প্রণাম বিনিময়, কুশল বিনিময় আর পুরনো দিনের গল্পে ভরে ওঠে বাড়ির অন্দরমহল। কোথাও ঠাকুরদালানের এক কোণে বসে চলছে পুজোর নানা খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা, কোথাও রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ভোগের সুবাস। বাড়ির নিজস্ব নিয়ম মেনে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে এগিয়ে চলে সন্ধ্যার পুজো।

একসময় এই বনেদি বাড়িগুলির পুজো ঘিরে বসত জমজমাট আসর। ইংরেজ সাহেবদের আপ্যায়ন, বাইজি নাচ, ধ্রুপদী সংগীত, যাত্রা কিংবা নাটকের আসরে উৎসবের সন্ধ্যা হয়ে উঠত অভিজাত কলকাতার সামাজিক জীবনের অন্যতম আকর্ষণ। সময়ের সঙ্গে সেই জাঁকজমকের অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। কোথাও বন্ধ হয়েছে নাচগানের আসর, কোথাও কমেছে আত্মীয়স্বজনের ভিড়, কোথাও বিশাল বাড়ির কয়েকটি ঘর আজ নিঃসঙ্গ। তবু ঠাকুরদালানে প্রদীপ জ্বলে, ঢাক বাজে, মন্ত্র পড়া হয়। ঐতিহ্যের সুতোটি এখনও ছিঁড়ে যায়নি।

বনেদি বাড়ির ষষ্ঠীর সন্ধ্যার সৌন্দর্য আসলে শুধু প্রতিমার সাজে কিংবা প্রাচীন বাড়ির স্থাপত্যে নয়। তার আসল আকর্ষণ সময়ের সহাবস্থানে। একদিকে কয়েকশো বছরের প্রথা, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের উচ্ছ্বাস। একদিকে হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি, অন্যদিকে আগামী বছরের পুজোর অপেক্ষা। বাইরে যখন উৎসব ক্রমশ হয়ে উঠছে আলোকসজ্জা আর ভিড়ের প্রতিযোগিতা, তখন বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে ষষ্ঠীর সন্ধ্যা মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজো কেবল একটি উৎসব নয়—এ এক পরিবারের উত্তরাধিকার, এক শহরের ইতিহাস, এক জীবন্ত সংস্কৃতি।

সন্ধ্যা আরও গাঢ় হয়। পঞ্চপ্রদীপের আলোয় দেবীর মুখ যেন আরও মায়াময় হয়ে ওঠে। ঢাকের শব্দের তালে প্রদীপ নিয়ে আরতিতে মেতে ওঠেন পুরোহিত। বাড়ির প্রবীণ মানুষটি হয়তো একবার তাকান পুরনো ঠাকুরদালানের দিকে। তাঁর মনে পড়ে যায়, এই একই জায়গায় একদিন পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর বাবা, ঠাকুরদা কিংবা পরিবারের আরও কত মানুষ। তাঁরা আজ নেই, কিন্তু পুজো আছে। দেবী আছেন। ষষ্ঠীর সন্ধ্যা তাই বনেদি বাড়িতে শুধু উৎসবের সূচনা নয়, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক নীরব আলিঙ্গন। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে বলেন, মাগো, তুই দয়া করেছিস বলেই আরও একটা বছর তোর মুখ দেখতে পেলাম। তোর অশেষ কৃপা মা।

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha