ক্লাসিক চরিত্ররা সমকালীন চালচিত্রে: বিরল কৃতিত্বে সাহিত্যে নোবেল অ্যান কার্সনের
স্টকহোম: সাহিত্যে নোবেল পেলেন অ্যান কার্সন। ২০২৬ সালে সুইস অ্যাকাডেমি তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য সম্মানিত করে। কানাডীয় কবি, লেখক, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের গবেষক অ্যান কার্সন। সমকালীন সাহিত্যে কার্সনের স্বতন্ত্র অবদান এবং ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর বিরল সম্পর্কের জন্যই এই সম্মান প্রদান কার্সনকে। অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর লেখার মিশেল সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ সৃষ্টি করেছে। প্রাচীন সাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক শিল্পভাবনাকে জুড়ে দেওয়ার ক্ষমতা এবং লেখার মৌলিকতাকেই বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন অ্যান কার্সন।
১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোয় জন্ম অ্যান কার্সনের। প্রাচীন গ্রীক সাহিত্য ও ধ্রুপদী ভাষার প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে তিনি ক্লাসিক্স নিয়ে পড়াশোনা করেন। যা পরে তাঁর সাহিত্যজীবনের অন্যতম পরিচয় হয়ে ওঠে। গবেষণা, অধ্যাপনা, অনুবাদ আর সৃজনশীল লেখাকে একসঙ্গে নিয়ে তিনি নিজের কর্মজীবন গড়েছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দশক ধরে ক্লাসিক্স পড়িয়েছেন এবং ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্যের পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে চলেছেন। তাঁর একাডেমিক পটভূমির ছাপ সৃজনশীল লেখাতেও স্পষ্ট।
কোনও একটি সাহিত্যধারার গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখেননি কার্সন। তাঁর লেখায় কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ, অনুবাদ, নাটক ও তাঁর প্রজ্ঞান হাত ধরাধরি করে থাকে। এই অভিনব পথই তাঁকে সমকালীন সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর করে তুলেছে। প্রাচীন ও আধুনিক জগৎকে এক সুতোয় বাঁধার ক্ষমতাই তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় গুণ। গ্রীক পুরাণ, ধ্রুপদী কবিতা ও প্রাচীন দর্শন তাঁর লেখায় বারবার আসে। কিন্তু পুরোনো গল্পের পুনরাবৃত্তি তিনি করেন না। সেগুলোকে বদলে নিয়ে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, একাকীত্ব, সৃষ্টি, ধ্বংসকে দেখাতে পারেন তিনি। কখনও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষ্যের সঙ্গে কাব্যিক অংশের মিশ্রণ। আবার কখনও প্রাচীন চরিত্রকে দিয়ে সমকালের গল্প বলান। এই পরীক্ষামূলক কাজকেই প্রশংসা করেছেন নোবেল কমিটি।
কার্সনের কাজ বিভিন্ন সাহিত্যরূপে ছড়িয়ে আছে। সবচেয়ে পরিচিত বই ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত অটোবায়োগ্রাফি অব রেড। প্রাচীন গ্রীক কবি স্টেসিকোরাসের একটি কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত এই কাব্য-উপন্যাসে পৌরাণিক চরিত্র গেরিয়নকে আধুনিক তরুণ হিসেবে নতুন রূপে কল্পনা করা হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’, যেখানে কবিতা ও আখ্যানের মিশ্রণে সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ খুঁজে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ ছাড়া লিখেছেন ‘ইরস দ্য বিটারসুইট’, ‘ডিক্রিয়েশন’, ‘রেড ডক>’, ‘নক্স ও ফ্লোট’। প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের তাঁর অনুবাদও যথেষ্ট আলোচিত। কার্সনের কাছে অনুবাদ শুধু এক ভাষার শব্দ আরেক ভাষায় নিয়ে যাওয়া নয়; এটি সৃজনশীল লেখা ও ব্যাখ্যারই আরেক রূপ।
ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে কার্সন নিজেকে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন, সেটাই বিস্মিত করেছে নোবেল কমিটিকে। প্রাচীন সাহিত্যকে সেকেলে জিনিস না ভেবে তিনি তার মধ্যে আধুনিক চরিত্র নিয়ে এসে পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে ফেলেছেন। তাঁর কাজ দেখায়, পুরোনো পুরাণ, কবিতা ও ভাবনাকে নতুন করে গড়ে সমকালীন প্রশ্নের জবাব খোঁজা অপরাধ নয়। এতে সেই প্রাচীন ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যায় না, আরও বেশি সুদৃঢ়-সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সাহিত্যরূপ ও ঐতিহ্যকে মেলানোর মধ্য দিয়ে তাঁর লেখা সাহিত্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, এ কথাও অ্যাকাডেমি বিশেষভাবে বলেছে।
নোবেলের খবরে কার্সনের প্রতিক্রিয়া
খবরটি যখন তাঁর কাছে পৌঁছায়, কার্সন তখন আইসল্যান্ডে ছিলেন। সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবেরি জানিয়েছেন, ঘোষণায় কার্সন বিস্মিত হয়েছেন এবং অত্যন্ত খুশি। ২০২২ সাল থেকে তিনি আইসল্যান্ডের নাগরিক, তবে কানাডা ও তার সাহিত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অটুট রয়েছে। ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেলের অর্থমূল্য ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা, প্রায় ১২ লক্ষ মার্কিন ডলার। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হবে ডিসেম্বরে, স্টকহোমে।
কার্সনের এই অর্জন কানাডীয় সাহিত্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত সাহিত্যিকদের তালিকায় আরও একজন কানাডীয় লেখক যুক্ত হলেন। ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া কানাডীয় লেখক অ্যালিস মানরোর পাশে তিনিও এই ঐতিহ্যের অংশ হলেন। এই পুরস্কার পরীক্ষামূলক সাহিত্যের আন্তর্জাতিক গুরুত্বও তুলে ধরে। কার্সনের কাজ প্রমাণ করে, কবিতা ও সাহিত্য, পুরাণ, ইতিহাস ও সমকালীন জীবনের সঙ্গে মিলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
